পৈতৃক সম্পত্তি ভাই ভোগ করলে, বোন কি তার অংশ দাবি করতে পারবে না?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “পৈতৃক সম্পত্তি ভাই ভোগ করলে, বোন কি তার অংশ দাবি করতে পারবে না?” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

“বাবা-মায়ের সম্পত্তি তো ভাইরাই ভোগ করছে, এতদিন পর আমি কি আর ওটার অংশ দাবি করতে পারবো? ভাইদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে কি আসলেই লাভ হবে?” কথাগুলো বলছিলেন শায়লা বানু। যদিও এই বলার পিছনে রয়ে গেছে ভাইদের কিছু ভয়াবহ কুপ্ররোচনা!

কয়েকদিন আগের কথা। শায়লা বানুর সাথে তার পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে কথা হচ্ছিল। তার বাবা মারা গেছেন আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে। এতগুলো বছর ধরে বাবার বাড়ি, চাষের জমি সবকিছুই তার ভাইয়েরা ভোগদখল করছেন।

শায়লা যখনই নিজের অংশটুকু চেয়েছেন, ভাইয়েরা অতি আদর-যত্নে তাকে বুঝিয়েছেন, “তুই তো সুখ সংসার করছিস, জমি তো আমাদের কাছেই আছে। তাছাড়া এতদিন আমরাই সব দেখাশোনা করলাম, এখন কি আর আলাদা করে ভাগ দেওয়া যায়?”

আমাদের সমাজে শায়লার মতো হাজারো বোন এই একই মানসিক চাপ আর ভুল ধারণার মধ্য দিয়ে যান। তারা ভাবেন, দীর্ঘদিন ভাইরা সম্পত্তি দখলে রাখলে হয়তো বোনের আর কোনো অধিকার থাকে না। আজ খুব পরিষ্কার করে এই ভুল ধারণাটি ভেঙে দিতে চাই।

ভাইরা দীর্ঘদিন দখলে রাখলেই কি বোনের অধিকার শেষ হয়ে যায়?

সহজ উত্তর হলো- না, কখনোই নয়। আইনত, পৈতৃক সম্পত্তিতে বোনের অধিকার আজীবন অক্ষুণ্ন থাকে। ভাইরা সম্পত্তি ভোগদখল করলেই বোনের মালিকানা স্বত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায় না। মুসলিম আইন অনুযায়ী, পিতা বা মাতার মৃত্যুর মুহূর্তেই পুত্র সন্তানের মতোই কন্যাসন্তানও তার অংশের স্বয়ংক্রিয় মালিক হয়ে যান।

আইনে একটি কথা আছে— “এক অংশীদারের দখল অর্থ, সকল অংশীদারের দখল” (Possession of one co-sharer is the possession of all co-sharers)। অর্থাৎ, বণ্টননামা দলিল বা বাটোয়ারা না হওয়া পর্যন্ত ভাইরা যদি সম্পত্তিতে থাকেন, তবে ধরে নেওয়া হয় তারা বোনের পক্ষ থেকেই সেখানে আছেন। আইনত একে ‘প্রতিকূল দখল’ বা Adverse Possession হিসেবে দাবি করে বোনকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

বোন সম্পত্তি না পেলে আইনি প্রতিকার কী?
যদি আলোচনার মাধ্যমে বা আপোশে ভাইয়েরা সম্পত্তি বুঝিয়ে দিতে অস্বীকার করেন, তবে একজন বোন হিসেবে আপনার সামনে আইনি লড়াইয়ের স্পষ্ট পথ খোলা রয়েছে:

১. বাটোয়ারা মামলা (Partition Suit):
সম্পত্তি আলাদা করার সবচেয়ে কার্যকর দেওয়ানি আইনি মাধ্যম হলো বাটোয়ারা বা বণ্টন মামলা। এই মামলার মাধ্যমে আদালত সুনির্দিষ্টভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বোনের অংশ বন্টন করে দেন এবং হিসেব বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

২. তামাদি আইনের নিয়ম (Limitation Act, 1908):
অনেকে মনে করেন মামলা করার নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু তামাদি আইনের ১৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোনো ভাই বোনকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করে নিজের নামে একক মালিকানা দাবি করার চেষ্টা (Ouster) না করেন, তবে বাটোয়ারা মামলার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা তামাদি নেই। অর্থাৎ, যেকোনো সময় এই মামলা করা যায়। তবে ভাইয়েরা যদি বোনকে সম্পত্তি দিতে একদমই অস্বীকার করেন, তবে সেই অস্বীকার করার দিন থেকে ১২ বছরের মধ্যে বাটোয়ারা মামলা ফাইল করা সবচেয়ে নিরাপদ।

৩. ফৌজদারি প্রতিকার:
যদি ভাইয়েরা সম্পত্তি দিতে অস্বীকৃতির পাশাপাশি বোনকে পৈতৃক বাড়িতে প্রবেশে বাধা দেন বা ভয়ভীতি দেখান, তবে বোন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারা অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দখল বজায় রাখার জন্য আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।

বিশেষ পরামর্শ: পৈতৃক সম্পত্তি কোনো দয়া, দান বা ভাইদের দেওয়া উপহার নয়। এটি আপনার সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত এবং রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা সুরক্ষিত একদম নিজস্ব অধিকার। ভাইদের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার অজুহাতে নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না। মনে রাখবেন, হকের কথা বলা কোনো পাপ বা অপরাধ নয়।

Share the Post:
Scroll to Top