রাগের মাথায় মুখ ফসকে তিনবার ‘তালাক’ বলে দিলেন, আর তাতেই কি ১৫ বছরের সংসার এক নিমিষেই শেষ? সমাজ যা-ই বলুক, দেশের আইন কিন্তু অন্য কথা বলে!
গত সপ্তাহে আমার চেম্বারে এক দম্পতি এসেছিলেন। দুজনের চোখেই জল। পারিবারিক একটা সাধারণ বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে স্বামী চরম উত্তেজিত হয়ে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একসাথে তিনবার ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করে ফেলেন। পরক্ষণেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি অনুতপ্ত হন। কিন্তু বাধ সাধলো সমাজ ও স্থানীয় কিছু ফতোয়াবাজ।
তারা ফতোয়া দিল— “বিয়ে ভেঙে গেছে, এখন হিল্লা বিয়ে ছাড়া একসাথে থাকার কোনো উপায় নেই।” এই সামাজিক কুসংস্কার আর মিথ্যে ভয়ের কারণে দুটি জীবন ও তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এক রাতে অন্ধকারের মুখে পড়ে যায়।
আমাদের সমাজে আজও হাজার হাজার মানুষ মনে করেন, মুখে তিনবার ‘তালাক’ বললেই বুঝি বৈবাহিক সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়ে যায়। চলুন আজ জেনে নিই এই বিষয়ে সমাজ বনাম আইনি বাস্তবতার আসল ফারাক কোথায়।
১. মুখে তালাক দিলেই কি সব শেষ?
বাংলাদেশের প্রচলিত ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কেবল মুখে মুখে তিনবার ‘তালাক’ উচ্চারণ করলেই বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর হয় না। আইনগতভাবে তালাক দিতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট এবং বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
২. আইনি নোটিশের গুরুত্ব ও প্রক্রিয়া
আইন অনুযায়ী তালাক কার্যকর করার জন্য প্রধানত তিনটি ধাপ রয়েছে:
লিখিত নোটিশ: তালাক দেওয়ার পর স্বামীকে অবশ্যই স্থানীয় চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে লিখিতভাবে নোটিশ দিতে হবে।
স্ত্রীকে অনুলিপি প্রদান: সেই নোটিশের একটি কপি বা অনুলিপি বাধ্যতামূলকভাবে স্ত্রীকে পাঠাতে হবে।
৯০ দিনের অপেক্ষা (ইদ্দতকাল): নোটিশ পাওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৯০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এই ৯০ দিন পার হওয়ার আগে কোনোভাবেই তালাক চূড়ান্ত বা কার্যকর হবে না।
৩. সালিসি পরিষদ ও আপসের সুযোগ
চেয়ারম্যান বা মেয়র নোটিশ পাওয়ার পর উভয় পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে একটি ‘সালিসি পরিষদ’ গঠন করবেন। এই ৯০ দিনের মধ্যে যদি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মিটমাট হয়ে যায়, তবে স্বামী যেকোনো সময় তার দেওয়া তালাক প্রত্যাহার করে নিতে পারেন এবং তারা স্বাভাবিকভাবে সংসার চালিয়ে যেতে পারেন। এর জন্য কোনো ‘হিল্লা বিয়ে’র প্রয়োজন নেই। মনে রাখবেন, বাংলাদেশে হিল্লা বিয়ে দেওয়া বা বাধ্য করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
৪. নোটিশ না দিলে কী আইনি জটিলতা হয়?
আইনি নোটিশ না দিয়ে কেবল মুখে তালাক দিয়ে বা কাজী অফিসে না গিয়ে আলাদা থাকলে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় না। নোটিশ না দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা ‘বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় পুনরায় বিয়ে’ হিসেবে গণ্য হবে, যা দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া নোটিশ না দিলে স্বামী হিসেবে স্ত্রীর ভরণপোষণ ও দেনমোহর দেওয়ার আইনি দায় থেকে কোনোভাবেই মুক্তি পাওয়া যাবে না।
আপনার জন্য পরামর্শ: আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। রাগের মাথায় বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হলে সামাজিক গুজবে কান না দিয়ে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।