সংসার টিকিয়ে রাখার আইনি চেষ্টা, নাকি নারীকে কোণঠাসা করার প্রচ্ছন্ন হাতিয়ার? ‘দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার’ মামলার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল সত্যটা কী?
কিছুদিন আগের ঘটনা। এক ভদ্রমহিলা কাঁদতে কাঁদতে আমার চেম্বারে এলেন। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নিয়মিত যৌতুকের দাবি আর মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি তিন সন্তানসহ বাবার বাড়ি চলে এসেছেন। ভরণপোষণ বা দেনমোহর চেয়ে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তার কাছে আদালত থেকে একটা সমন এলো।
স্বামী তার বিরুদ্ধে ‘দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার’ -এর মামলা করেছেন! মামলার আরজিতে লেখা, “স্ত্রী কোনো কারণ ছাড়াই স্বামীকে ত্যাগ করেছেন।” ভদ্রমহিলা আতঙ্কিত হয়ে আমাকে বললেন, “অ্যাডভোকেট সাহেব, ওরা কি এই মামলা দিয়ে আমার মুখ বন্ধ করতে চায়? আমি কি এখন আমার অধিকারের দাবিও করতে পারব না?”
আমাদের সমাজে এই চিত্রটি খুব চেনা। অনেক সময় দেখা যায়, স্ত্রী যখন নিজের আইনি অধিকার (যেমন দেনমোহর বা খোরপোশ) দাবি করতে যান বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন, তখন পাল্টা চাপ সৃষ্টি করার জন্য এই মামলাটিকে একটি ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
আইনগত ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স:
আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং ভাঙনমুখী পরিবারকে রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে এর অপপ্রয়োগের চেষ্টা চলে অহরহ।
চাপ সৃষ্টির কৌশল: যখন কোনো স্বামী বুঝতে পারেন যে স্ত্রী তার বিরুদ্ধে খোরপোশ বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারেন, তখন আইনি সুবিধা পেতে বা স্ত্রীকে মানসিক চাপে রাখতে তড়িঘড়ি করে এই মামলা ঠুকে দেন। উদ্দেশ্য থাকে আদালতে প্রমাণ করা, “আমি তো সংসার করতেই চেয়েছিলাম, স্ত্রীই আসেনি।”
আদালতের সতর্ক অবস্থান: বাংলাদেশের পারিবারিক আদালতগুলো এখন এই বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধু মামলা ঠুকে দিলেই পার পাওয়া যাবে না। স্বামী যদি মামলা করেন, তবে তাকেই আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি একজন আদর্শ স্বামী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং স্ত্রী “বিনা কারণে” আলাদা থাকছেন।
আইন কী বলে বনাম বাস্তবে কী হয়:
আইন কী বলে: আইন বলে, এই মামলাটি কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন বাদী (স্বামী) নিজে সৎ উদ্দেশ্যে (Bona fide) এবং পরিষ্কার হাত নিয়ে আদালতের কাছে আসবেন। নিজের দোষ বা নির্যাতন আড়াল করতে এই মামলা করা হলে তা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।
বাস্তবে কী হয়: বাস্তবে অনেক সময় পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে ভাবা হয়, মামলার ভয় দেখালে নারীরা আপস করতে বাধ্য হবেন। কিন্তু একজন সচেতন নারী যখন আদালতে স্বামীর পূর্ববর্তী নির্যাতন, যৌতুক দাবি কিংবা দেনমোহর বাকি থাকার প্রমাণ (যেমন: জিডি কপি, সালিশের কাগজ বা চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন) তুলে ধরেন, তখন এই ‘অস্ত্র’ উল্টো স্বামীর বিরুদ্ধেই যায়। আদালত তখন স্বামীর উদ্দেশ্যকে ‘অসৎ’ হিসেবে গণ্য করে মামলাটি খারিজ করে দেন।
আপনার জন্য পরামর্শ: একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করবেন। কেননা, আইনকানুনগুলো একই হলেও প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপনও ভিন্ন হবে। উপরোক্ত আলোচনায় সাধারণভাবে প্রতিকারগুলো কী কী হতে পারে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।