“আমার কাছে তো ওর চ্যাটিংয়ের স্ক্রিনশট আর কল রেকর্ড আছে, মামলা করলেই আমি জিতে যাবো!”
পারিবারিক কলহ বা পরকীয়ার অভিযোগে আইনি প্রতিকার চান – এমন অধিকাংশ মানুষের মুখে এই একটি কথা আমি প্রায়ই শুনি। মানুষ ভাবেন, ওপাশ থেকে আসা একটা মেসেজের স্ক্রিনশট কিংবা মোবাইলে লুকিয়ে রেকর্ড করা একটা অডিও ক্লিপই আদালতে পরকীয়া প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।
কিন্তু একজন আইনজীবী হিসেবে আপনাদের একটি বাস্তব সত্য জানাই, আইনের চোখে বিষয়টি এত সহজ নয়।
ডিজিটাল যুগে প্রমাণ যেমন সহজে পাওয়া যায়, তেমনি তা সহজে ‘ম্যানিপুলেট’ বা এডিটও করা যায়। আর ঠিক এই কারণেই যেকোনো ডিজিটাল এভিডেন্স (Digital Evidence) আদালতে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কঠোর আইনি ও প্রযুক্তিগত নিয়ম রয়েছে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, আপনার হাতের ডিজিটাল প্রমাণগুলো আদালতে আসলেই কতটা গ্রহণযোগ্য:
১. ফেসবুক মেসেজ ও হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট
অনেকেই স্ক্রিনশট প্রিন্ট করে আদালতে জমা দেন। মনে রাখবেন, শুধু কাগজের স্ক্রিনশট অনেক সময় ‘সেকেন্ডারি এভিডেন্স’ হিসেবেও দুর্বল হয়ে পড়ে, কারণ স্ক্রিনশট ফেক বা এডিটেড হতে পারে।
আইন কী বলে: বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (Evidence Act)-এর সাম্প্রতিক সংশোধনী অনুযায়ী, ডিজিটাল রেকর্ড আদালতে গ্রহণযোগ্য। তবে এর জন্য মূল ডিভাইসটি (মোবাইল বা ল্যাপটপ) সোর্স হিসেবে দেখাতে হতে পারে, কিংবা বিটিআরসি (BTRC) বা সাইবার ফরেনসিক ল্যাবের সার্টিফাইড রিপোর্টের প্রয়োজন হতে পারে। চ্যাট হিস্ট্রির সত্যতা নিশ্চিত করতে অপর পক্ষের প্রোফাইল লিংক (URL) ও ইউজার আইডি সংরক্ষণ করা জরুরি।
২. অডিও কল রেকর্ড
লুকিয়ে রেকর্ড করা কললিস্ট বা কথোপকথন কি প্রমাণ হিসেবে টিকবে? হ্যাঁ, টিকতে পারে, তবে সেখানে বড় ‘কিন্তু’ আছে। আদালতে যদি অপর পক্ষ দাবি করে যে এই ভয়েস তার নয়, কিংবা এটি এআই (AI) দিয়ে ক্লোন করা বা এডিটেড – তখন আদালত সেটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠাতে পারেন। রেকর্ডের চেইন অব কাস্টডি (Chain of Custody) অর্থাৎ প্রমাণটি পাওয়ার পর থেকে কীভাবে সংরক্ষিত ছিল, তা পরিষ্কার হতে হবে।
৩. ইমেইল, ছবি এবং ভিডিও
হোটেল বুকিংয়ের কনফার্মেশন ইমেইল, উবার রাইডের হিস্ট্রি কিংবা অন্য কারও সাথে আপত্তিকর অবস্থার ছবি বা ভিডিওকে আদালত বেশ গুরুত্ব দেয়। এগুলোকে ‘পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য’ (Circumstantial Evidence) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই ছবি বা ভিডিওগুলো কোন ডিভাইসে ধারণ করা হয়েছে এবং তা কোনোভাবে টেম্পারিং বা এডিট করা হয়েছে কি না, তা প্রমাণ করার আইনি দায়ভার কিন্তু যিনি মামলা করছেন তার ওপরই বর্তায়।
একটি জরুরি আইনি সতর্কতা:
পরকীয়ার প্রমাণ জোগাড় করতে গিয়ে আপনি যদি জীবনসঙ্গীর ফোন হ্যাক করেন, স্পাইওয়্যার অ্যাপ ব্যবহার করেন কিংবা জোরপূর্বক পাসওয়ার্ড কেড়ে নিয়ে ডেটা চুরি করেন, তবে হিতে বিপরীত হতে পারে। প্রমাণ পাওয়ার আনন্দের চেয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী আপনার নিজেরই জেল-জরিমানা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মোদ্দাকথা, ডিজিটাল প্রমাণ অবশ্যই আপনার মামলাকে শক্তিশালী করবে, তবে তা হতে হবে আইনসম্মত উপায়ে সংরক্ষিত ও উপস্থাপিত। এলোমেলোভাবে প্রমাণ জমা দিলে তা আদালত খারিজ করে দিতে পারে। আপনার পারিবারিক অধিকার রক্ষা করুন, তবে তা অবশ্যই সঠিক আইনি প্রক্রিয়ায়।