আমাদের সমাজে একটা মস্ত বড় ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন, সংসার যখন ভেঙেই গেল কিংবা স্বামী যখন দুনিয়া ছেড়েই চলে গেলেন, তখন আর দেনমোহর দিয়ে কী হবে! অনেকে আবার আবেগের বশে বা পারিবারিক চাপে পড়ে বিধবা স্ত্রীকে দিয়ে জোরপূর্বক বা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে দেনমোহর ‘মাফ’ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
আইন ও অধিকারের জায়গায় এটি একটি বিরাট ভুল পদক্ষেপ! তথাকথিত এই ‘মাফ’ করে দেওয়ার সামাজিক প্রথার আড়ালে অনেক নারী চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন।
চলুন আজ বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাক।
আইনি সত্য: দেনমোহর কোনো দয়া নয়, এটি স্বামীর ওপর একটি ‘ঋণ’
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, দেনমোহর (Dower) হলো স্ত্রীর একটি আইনগত অধিকার, যা বিয়ের সময় স্বামী তাকে দিতে বাধ্য থাকেন। এটি কোনো উপহার বা দয়া নয়, বরং স্বামীর ওপর স্ত্রীর একটি সুনির্দিষ্ট পাওনা বা ডেট (Debt)।
আর যেকোনো ঋণের মতোই, এই ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত স্বামী বা তার পরিবার দায়মুক্ত হতে পারেন না।
১. বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক হলে কী হবে?
সংসার টেকেনি বা তালাক হয়ে গেছে – এর মানে এই নয় যে দেনমোহর দিতে হবে না। বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া মাত্রই স্ত্রীর দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা (যদি আগে পরিশোধ করা না হয়ে থাকে) অবিলম্বে পরিশোধ করা স্বামীর আইনি বাধ্যবাধকতা। স্ত্রী তালাক দিন কিংবা স্বামী, দেনমোহরের অধিকার কোনো অবস্থাতেই নষ্ট হয় না।
২. স্বামী মারা গেলে কি দেনমোহর মাফ হয়?
একেবারেই নয়। স্বামী মারা গেলেও এই ঋণ মুছে যায় না। আইন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের খরচের পরই তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি (উত্তরাধিকারদের মধ্যে বণ্টনের আগে) থেকে সবার আগে তার দেনমোহরের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, স্বামীর সম্পত্তির ওপর অন্য সব ওয়ারিশদের (যেমন: ছেলে, মেয়ে বা ভাই-বোন) অধিকার আসার আগেই স্ত্রীর দেনমোহর বুঝিয়ে দিতে হবে।
আইনগত রেফারেন্স ও প্রতিকার:
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961): এই আইন অনুযায়ী, কাবিননামায় দেনমোহর পরিশোধের সুনির্দিষ্ট সময় উল্লেখ না থাকলে, স্ত্রী চাওবামাত্রই (On Demand) স্বামী তা পরিশোধ করতে বাধ্য।
১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ (Family Courts Ordinance, 1985): কোনো স্বামী বা তার পরিবার যদি তালাক বা মৃত্যুর পর দেনমোহর পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ভুক্তভোগী নারী দেনমোহর আদায়ের জন্য সরাসরি পারিবারিক আদালতে (Family Court) মামলা করে তার আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
বিশেষ পরামর্শ: আইনি অজ্ঞতার কারণে নিজের অধিকার হাতছাড়া করবেন না। দেনমোহর স্ত্রীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার দেয়াল। বিয়ের চুক্তিকে সম্মান করুন, নারীর অধিকার রক্ষা করুন। আইন জানুন, সচেতন থাকুন।