সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কেনা জমি কি আসলেই যখন-তখন বিক্রি করা যায়?
অনেক বাবা-মা ভাবেন, “সন্তান তো আমারই, আর জমিটাও আমিই ওর নামে কিনে দিয়েছি। এখন প্রয়োজনে বিক্রি করতে বাধা কোথায়?” অথবা অনেক সময় কোনো শিশুর বাবা মারা যাওয়ার পর মা মনে করেন, সন্তানের মঙ্গলের জন্যই তো জমিটা বিক্রি করছি, তাহলে সমস্যা কী?
এখানেই লুকিয়ে আছে একটি মস্ত বড় আইনি ভুল। আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত এই একটি ভুলের কারণে শত শত পরিবার জমি কেনাবেচা করতে গিয়ে বড় ধরনের আইনি ও আর্থিক জটিলতায় পড়ছেন।
আজ একজন আইনজীবী হিসেবে এই বিষয়ে আপনাদের একদম পরিষ্কার এবং আইনি ধারণা দেব।
চলুন প্রথমেই জেনে নেয়া যাক, আইন কী বলে?
মুসলিম আইন অনুযায়ী পিতা হলেন সন্তানের প্রাকৃতিক অভিভাবক (Natural Guardian)। পিতার অবর্তমানে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে দাদা এই দায়িত্ব পান। অন্যদিকে, মা কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় হলেন সন্তানের ‘তত্ত্বাবধায়ক’ বা শরীরী অভিভাবক (Custodian)।
কিন্তু আইন খুব স্পষ্টভাবে বলছে, প্রাকৃতিক অভিভাবক (যেমন বাবা) হলেও, আদালতের পূর্ব অনুমতি ছাড়া নাবালক সন্তানের কোনো স্থাবর সম্পত্তি (যেমন: জমি, ফ্ল্যাট বা ভিটেমাটি) বিক্রি, বন্ধক, দান বা কোনোভাবে হস্তান্তর করা যায় না। আর মায়ের ক্ষেত্রে এই নিয়ম আরও অনেক বেশি কঠোর।
কিছু আইনগত রেফারেন্স জেনে নেয়া যাক:
১৮৯০ সালের গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট (The Guardians and Wards Act, 1890) এর ২৯ ধারা অনুযায়ী, আদালতের অনুমতি ব্যতীত নাবালকের সম্পত্তি হস্তান্তর করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি কেউ আদালতের অনুমতি ছাড়া নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি করেন, তবে সেই বিক্রয় দলিলটি শুরু থেকেই আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং বাতিলযোগ্য।
এমনকি নাবালক সন্তানটি যখন ১৮ বছর পূর্ণ করে সাবালক হবে, তখন সে চাইলে আইনগতভাবেই এই বিক্রয়কে চ্যালেঞ্জ করে নিজের সম্পত্তি ফেরত পেতে পারে। সুতরাং, সেই সময় যিনি টাকা দিয়ে জমিটি কিনেছিলেন, তিনি চরম বিপদে পড়বেন।
তাহলে উপায় কী?
নাবালকের সম্পত্তি যদি আসলেই কোনো জরুরি প্রয়োজনে (যেমন: সন্তানের উচ্চশিক্ষা, মারাত্মক অসুস্থতার চিকিৎসা বা সম্পত্তিটি রক্ষণাবেক্ষণের চরম অভাব) বিক্রি করতেই হয়, তবে তার একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া আছে:
১. প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালতে প্রপার্টি গার্ডিয়ানশিপের অনুমতি চেয়ে আবেদন করতে হবে।
২. আদালত নিখুঁতভাবে যাচাই করবেন যে, সম্পত্তিটি বিক্রি করলে আসলেই নাবালকের কোনো উপকার হবে কি না।
৩. আদালত সন্তুষ্ট হলে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি (Permission) দেবেন।
আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ: না জেনে বা দালালের খপ্পরে পড়ে সন্তানের নামের সম্পত্তি আদালতের অনুমতি ছাড়া বায়না বা বিক্রি করতে যাবেন না। এতে আপনার কষ্টের টাকা যেমন ঝুঁকিতে পড়বে, তেমনই ভবিষ্যতে বড় ধরনের মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি হতে পারে। যেকোনো সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে একজন দক্ষ পারিবারিক আইন আইনজীবীর পরামর্শ নিন, সুরক্ষিত থাকুন।