বাবা-মায়ের ইগো আর জিদের যুদ্ধে সবচেয়ে বড় বলি কে হয় জানেন? তাদেরই নিষ্পাপ সন্তানটি, যার কোনো অপরাধই ছিল না।
গত সপ্তাহে ফ্যামিলি কোর্টের বারান্দায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখলাম। ৭ বছরের একটি শিশু, যাকে মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দুই দিকে টানছেন তার বাবা আর মা। বাবা বলছেন, “সন্তান আমার বংশ, ও আমার কাছে থাকবে।”
মা কাঁদছেন আর বলছেন, “আমি ওকে গর্ভে ধরেছি, ও আমার কোল ছাড়া কোথাও যাবে না।”বাবা-মায়ের এই অহংবোধ আর আইনি লড়াইয়ের মাঝে বাচ্চাটির চোখের ভয় আর এক অদ্ভুত মানসিক ট্রমা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।
বিবাহ বিচ্ছেদ যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন তার সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে তাদেরই রক্ত-মাংসের সন্তানের ওপর। একজন আইনজীবী হিসেবে আমাকে বহুবার এমন ঘটনার সাক্ষী হতে হয়েছে। আজ আমি আপনাদের সামনে তেমনই কিছু আইনি ও বাস্তবিক সত্য তুলে ধরছি।
১. সন্তানের হেফাজত বা জিম্মাদারী (Custody) কার?
আমাদের সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো— মা তালাক দিলে সন্তান বাবা পাবে, আর বাবা তালাক দিলে মা পাবে। কিন্তু আইন এটি বলে না। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী:
পুত্র সন্তান ৭ বছর বয়স পর্যন্ত এবং কন্যা সন্তান বয়ঃসন্ধি বা বিয়ের বয়স পর্যন্ত মায়ের হেফাজতে (Hizanat) থাকবে।
তবে মনে রাখবেন, মা কেবল সন্তানের শারীরিক জিম্মাদার (Custody) পান, কিন্তু আইনগত অভিভাবক (Guardian) সবসময় বাবাই থাকেন।
২. আদালতের মূল বিবেচ্য বিষয়: সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ (Welfare of the Child)
উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নজির রয়েছে যে, সন্তানের বয়স যা-ই হোক না কেন, আদালত সবার আগে দেখবে সন্তান কার কাছে বেশি নিরাপদ এবং কার কাছে থাকলে তার ভবিষ্যৎ ভালো হবে।
যদি প্রমাণিত হয় যে মায়ের কাছে সন্তান সুরক্ষিত নয় (যেমন— মা অনৈতিক জীবনযাপন করছেন বা সন্তানকে অবহেলা করছেন, বা মায়ের মানসিক সমস্যা ইত্যাদি থাকে), তবে আদালত নির্দিষ্ট বয়সের আগেই বাবাকে হেফাজত দিতে পারেন। ঠিক একইভাবে, বাবা যদি উপযুক্ত না হন, তবে কন্যা সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও মায়ের কাছে থাকতে পারে।
৩. দেখার অধিকার (Visitation Rights)
সন্তান যার কাছেই থাকুক না কেন, অপর পক্ষ (মা বা বাবা) সন্তানকে দেখতে পাবেন না— এমন কোনো নিয়ম নেই। আদালত অপর পক্ষকে সপ্তাহে বা মাসে সুনির্দিষ্ট দিনে সন্তানের সাথে দেখা করার বা সময় কাটানোর অধিকার নিশ্চিত করেন।
৪. ভরণপোষণের দায়িত্ব কার?
বিচ্ছেদ হয়ে গেলে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব শেষ হতে পারে, কিন্তু সন্তানের প্রতি বাবার দায়িত্ব আজীবন থেকে যায়। সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও তার লেখাপড়া, চিকিৎসা, খাবার ও কাপড়ের সম্পূর্ণ খরচ বাবাকেই বহন করতে হবে। এটি অমান্য করলে পারিবারিক আদালতে মামলা করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
আপনার জন্য পরামর্শ: আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। সন্তানের জিম্মাদারী বা অভিভাবকত্ব নিয়ে কোনো জটিলতা দেখা দিলে আবেগের বশবর্তী না হয়ে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।