“স্যার, আমি জানি ও ভুল করেছে, কিন্তু আমি সংসার ভাঙতে চাই না। আমি শুধু চাই সে আবার সংসারে ফিরে আসুক। এই অবস্থায় কি কোনো পথ আছে?” কথাগুলো বলছিলেন মিসেস শেফালি আক্তার। তার চোখে জল। স্বামীর পরকীয়া নিয়ে তিনি সত্যি সত্যি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। একটা সময় স্বামীও স্বীকার করেছে সব। কিন্তু কেউই ফিরে আসার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।
শেফালি আক্তারের মতো এমন প্রশ্ন আমি অসংখ্য নারীর মুখে শুনেছি, শুনছি। পরকীয়া, একটি ভয়াবহ আঘাত। কিন্তু কখনই তালাক বা সেপারেশন এর শেষ দরজা নয়। অনেক দম্পতি চাইলে আবারও নতুনভাবে সম্পর্ক নির্মাণ করতে পারেন -যদিও সেটার জন্য প্রয়োজন হয় সঠিক পথ, সঠিক পরামর্শ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত।
আজ সেটাই বলছি।
১) ইসলামিক দৃষ্টিতে সমাধান খোঁজা: ইসলাম পরকীয়াকে কঠিন ও গুরুতর পাপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে একইসঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙার আগে সমাধান ও সংশোধন দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা যদি তাদের মাঝে বিরোধ আশঙ্কা কর, স্বামীর পক্ষ থেকে একজন সালিশ এবং স্ত্রীর পক্ষ থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত কর।” (সূরা নিসা, ৩৫) অর্থাৎ, ইসলাম প্রথমেই চায়, সমস্যা সমাধান, দু’পক্ষের ভুল সংশোধন এবং পরিবার রক্ষা। মনে রাখবেন, ডিভোর্স ইসলামে শেষ ধাপ, প্রথম ধাপ নয়।
২) দু’পক্ষের স্পষ্ট ও সততার সাথে কথা বলা: সম্পর্ক বাঁচাতে হলে প্রথমেই দরকার, একটি ‘হৃদয় থেকে হৃদয়ে’ কথা। এই আলোচনায় আসতে হবে, কী ভুল হয়েছে? কেন হয়েছে? সম্পর্ক কোন জায়গায় ভেঙেছে? ভবিষ্যতে কী প্রতিজ্ঞা বা পরিবর্তন দরকার? কোনগুলো না হলে সংসার টিকে না, ইত্যাদি এবং এটি করতে হয় শান্তভাবে, চিৎকার ছাড়া, পরস্পর দোষারোপ ছাড়া। অতীত মেনে নেয়ার ও ভুল সংশোধন করে ফিরে আসার মানসিকতা দুপক্ষেরই থাকতে হবে।
৩) পরিবার বা কাছের মানুষ দিয়ে সালিস বৈঠক বা আলোচনা: বাঙালি সমাজে সালিস বা পারিবারিক বৈঠক কখনো কখনো দাম্পত্য বাঁচাতে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। দুই পক্ষের বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল এবং উদার মনের কিছু মানুষ, ধর্মীয় বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য দুএকজন মধ্যস্থতাকারী এবং সম্পর্কের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান থাকা ব্যক্তিদের এক্ষেত্রে খুব দরকার।
সালিসের মাধ্যমে, পরকীয়ার কারণ, ভবিষ্যতের সীমারেখা, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত এসব নির্ধারিত যায়। অনেক সম্পর্ক এখান থেকেই নতুনভাবে শুরু হয়। ভরসা রাখুন, এই পথ বা উপায়গুলোর উপর।
৪) ফ্যামিলি থেরাপি বা কাউন্সেলিং (যা অনেকেই জানেন না): বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দাম্পত্য কাউন্সেলিং খুব কার্যকর হয়েছে। মানসিক আঘাত, অবিশ্বাস, রাগ-প্রতিহিংসা, যোগাযোগের সমস্যা অথবা যৌনজীবনের অসামঞ্জস্য, ইত্যাদি সব বিষয় কাউন্সেলর খুব বৈজ্ঞানিকভাবে সমাধান দেন। অনেক দম্পতি পরকীয়ার পর পুনরায় বিশ্বাস তৈরি করতে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সফল হয়েছেন। এমন ঘটনা অহরহ।
৫) সম্পর্ক বাঁচাতে কিছু নিয়ম ঠিক করা: দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিন, কারো সাথে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত চ্যাট থাকবে না, পাসওয়ার্ড গোপন রাখা হবে না, প্রয়োজন ছাড়া রাতের বাইরে থাকা কমাবেন, পরিবারে সময় দেওয়া বাড়াবেন ইত্যাদি। এইসব ‘সীমারেখা’ সম্পর্ককে নিরাপদ করে, পুনরায় সন্দেহ করা কমায় এবং অবিশ্বস্যভাবে আস্থা ফিরিয়ে আনে, সেই সাথে পরিবারের প্রতি আপনার প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে তোলে।
৬) দাম্পত্যকে নতুনভাবে সাজানো: বিশ্বাস ভাঙলে তা রাতারাতি ফিরে আসে না। ধীরে ধীরে, ছোট ছোট পদক্ষেপে সম্পর্ক আবার দাঁড়ায়। নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ি ফেরা, আচরণে ধারাবাহিক পরিবর্তন, সদা সত্য বলা, ক্ষতি পূরণের চেষ্টা এবং ক্ষমা চাওয়া বা নিদেনপক্ষে ‘সরি’ বলা ইত্যাদি আচরণ, এগুলো সম্পর্ককে ধীরে ধীরে সুস্থ স্বাভাকিত করে তোলে।
৭) আইনগত নিরাপত্তা জোরদার করা (যদি ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়ে): অনেক নারী সম্পর্ক বাঁচাতে গিয়ে নিজের অধিকার হারিয়ে ফেলেন। তাই সম্পর্ক রক্ষা করতে চাইলে ভরণপোষণ, দেনমোহর, সন্তানদের তত্ত্বাবধান ও অভিভাকত্ব, পারিবারিক আইনকানুন ইত্যাদি বিষয়ে আগে থেকেই সচেতন থাকতে হবে। আইন জানা মানে বিবাহ ভাঙা নয়, বরং সম্পর্ক রক্ষায় নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করা।
শেষ কথা, এটা মানতেই হবে যে, পরকীয়া একটি দুঃস্বপ্ন। কিন্তু ডিভোর্স এর একমাত্র পরিণতি নয়। যদি দুইজনই চান, শান্তভাবে বসে, সঠিক পদ্ধতিতে এগোলে অনেক সম্পর্কই নতুনভাবে সাজানো সম্ভব। আপনার সঠিক সিদ্ধান্ত আপনারই জীবন বদলে দিবে। আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জেনে নিন, বুঝে নিন, ভেবে নিন। মনে রাখবেন, পরকীয়া থেকে ফিরে আসার এই সহজ পথগুলো আপনার হাতেই।