সন্তান মায়ের কাছে থাকলেই কি মা তার অভিভাবক? জেনে নিন ‘অভিভাবক’ ও ‘জিন্মাদার’র মধ্যে আসল পার্থক্য।
বিচ্ছেদের পর অনেক মা মনে করেন সন্তান যেহেতু তার কাছে বড় হচ্ছে, তাই তিনিই সন্তানের একমাত্র অভিভাবক। আবার অনেক বাবা মনে করেন তিনি অভিভাবক বলেই যখন খুশি সন্তানকে নিয়ে যেতে পারেন। এই ভুল বোঝাবুঝির কারণে তৈরি হয় দীর্ঘ আইনি জটিলতা। চলুন আজ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করব।
কদিন আগের একটি ঘটনার কথা বলি। এক দম্পতির বিচ্ছেদের পর তাদের সাত বছরের ছেলেটি মায়ের কাছেই থাকছিল। মা চেয়েছিলেন সন্তানের পাসপোর্টের আবেদন করতে এবং তাকে বিদেশে একটি স্কুলে ভর্তি করাতে। কিন্তু তিনি যখন জানতে পারলেন যে সেখানে বাবার স্বাক্ষর বা অনুমতি আবশ্যিক, তখন তিনি ক্ষুব্ধ হলেন।
তার প্রশ্ন ছিল, “সন্তানকে বড় করছি আমি, তবে কেন সব সিদ্ধান্তে বাবার অনুমতি লাগবে?” ঠিক এখানেই জড়িয়ে আছে ‘তত্ত্বাবধান’ ও ‘অভিভাবকত্ব’ এর মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো।
বিস্তারিত আইনগত ব্যাখ্যা:
বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম আইন এবং The Guardians and Wards Act, 1890 অনুযায়ী দুটি বিষয়কে আলাদা করা হয়েছে:
১. আইনি অভিভাবক বা ন্যাচারাল গার্ডিয়ান (Legal Guardian):
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, পিতা হলেন সন্তানের ‘স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক অভিভাবক’। সন্তানের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ এবং বড় কোনো সিদ্ধান্ত (যেমন: শিক্ষা, দেশত্যাগ বা আইনি বিষয়) নেওয়ার ক্ষেত্রে বাবার অধিকার আইনসিদ্ধ। মা সাধারণত সন্তানের স্বাভাবিক আইনি অভিভাবক নন, যদি না আদালত তাকে বিশেষ ক্ষমতাবলে নিযুক্ত করেন।
২. জিম্মাদার বা তত্ত্বাবধায়ক (Custodian/Hizanat):
অন্যদিকে, মা হলেন সন্তানের প্রধান ‘জিম্মাদার’ বা তত্ত্বাবধানের (Hizanat) অধিকারী। একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত (ছেলে ৭ বছর এবং মেয়ে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত) সন্তানকে নিজের কাছে রাখা এবং লালন-পালন করার অধিকার মায়ের। একেই বলা হয় ‘হেজানত’। সহজ কথায়, সন্তান মায়ের কাছে ‘শারীরিক আশ্রয়ে’ থাকলেও আইনি অভিভাবক হিসেবে বাবার দায়বদ্ধতা ও অধিকার বহাল থাকে।
পার্থক্যটি কেন জরুরি?
অনেকে মনে করেন মা তত্ত্বাবধানের অধিকার পাচ্ছেন মানেই বাবা তার অধিকার হারিয়েছেন, বিষয়টি তা নয়। আবার বাবা অভিভাবক বলেই জোর করে মায়ের কাছ থেকে সন্তান নিয়ে যাবেন, সেটিও আইনসম্মত নয়। উভয়ের অধিকারের এই ভারসাম্যই সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
সচেতনতামূলক বার্তা:
বিচ্ছেদ মানেই সন্তানের সাথে সম্পর্কের শেষ নয়। মা হিসেবে আপনার তত্ত্বাবধানের অধিকার যেমন সংরক্ষিত, তেমনি বাবা হিসেবে তার দায়িত্বগুলোও আইনস্বীকৃত। এই পার্থক্যের সঠিক প্রয়োগই পারে সন্তানের ভবিষ্যৎকে সংঘাতমুক্ত রাখতে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ: আইন সবার জন্য এক হলেও প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পরিবেশ ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও সমাধানও ভিন্ন হতে পারে। সঠিকভাবে আইনি পদক্ষেপ নিতে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করা আবশ্যক। উপরের আলোচনাটি কেবল সাধারণ সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।