“তুমি তো নিজেই চাকরি করো, তবে আমার কাছে হাত পাতছ কেন?”
নীলা একটি বেসরকারি ব্যাংকে উচ্চপদে কর্মরত। তার স্বামীও বেশ ভালো আয় করেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তাদের দাম্পত্য কলহ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নীলা আলাদা থাকছেন। নীলা যখন সন্তানের খরচ এবং নিজের জন্য আইনত প্রাপ্য ভরণপোষণ চাইলেন, স্বামী অবাক হয়ে বললেন, “তোমার নিজেরই তো অনেক টাকা, আমি কেন দেব? আইন কি বলে না যে স্বাবলম্বী নারীরা ভরণপোষণ পায় না!”
নীলার মতো অনেক আত্মনির্ভরশীল নারী এই দ্বিধায় ভোগেন বা মিথ্যে প্ররোচনায় পড়ে যান এবং অধিকার ছেড়ে দেন। কিন্তু সত্যটা হলো, নারীদের নিজের আয় থাকা সত্ত্বেও স্বামীর আর্থিক দায়িত্ব বিন্দুমাত্র কমে যায় না।
আইনগত ব্যাখ্যা: কর্মজীবী স্ত্রীর অধিকার
১. স্ত্রীর আর্থিক অবস্থা ধর্তব্য নয়: বাংলাদেশের পারিবারিক আইন এবং মুসলিম আইন অনুযায়ী, ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর একটি নিরঙ্কুশ ও আইনি বাধ্যবাধকতা। স্ত্রী বিত্তবান কি না বা তার নিজের আয়ের উৎস আছে কি না, তার ওপর এই দায়িত্ব নির্ভর করে না। স্ত্রী স্বাবলম্বী হলেও স্বামী তার সামাজিক মর্যাদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।
২. চাকরি করা কি অবাধ্যতা? অনেক স্বামী অভিযোগ করেন যে, স্ত্রী তার কথা না শুনে চাকরি করছেন, তাই তিনি খরচ দেবেন না। মনে রাখবেন, উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্ত্রী যদি সম্মানজনক কোনো পেশায় যুক্ত থাকেন, তবে তাকে ‘অবাধ্য’ বলে গণ্য করে ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই।
৩. সংসারের খরচে অংশগ্রহণ: নৈতিকভাবে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারেন, কিন্তু আইনত সংসারের এবং স্ত্রীর যাবতীয় ব্যক্তিগত খরচ (খাবার, পোশাক, চিকিৎসা) বহনের মূল দায়ভার স্বামীর কাঁধেই থাকে।
৪. আদালতের অবস্থান: পারিবারিক আদালত ভরণপোষণের অংক নির্ধারণের সময় স্বামীর আয় এবং জীবনযাত্রার মান দেখেন। স্ত্রী আয় করেন বলে স্বামীর দায়িত্ব শূন্য হয়ে যায় না; বড়জোর আদালত সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি যৌক্তিক অংক নির্ধারণ করে দেন।
বস্তুত, আপনার নিজের পরিচয় বা ক্যারিয়ার আছে মানেই আপনি আপনার আইনি অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন, এমনটা ভাবা ভুল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইন ও ইসলামি আইন, উভয় মতেই স্বামীকেই তার স্ত্রী ও সন্তানের নূন্যতম ভরণপোষণ নিশ্চিত করা তার আইনগত কর্তব্য।
আপনার জন্য পরামর্শ: প্রতিটি মামলার প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। আইনকানুনগুলো একই হলেও উপস্থাপনের ধরনে ফলের ভিন্নতা আসে। তাই যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন। উপরোক্ত আলোচনায় কেবল সাধারণ প্রতিকারগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।