বিয়েতে কনেকে গহনা দেওয়া আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু অনেক সময় এই গহনাই হয়ে দাঁড়ায় তিক্ততার কারণ। সম্পর্ক চলাকালীন যা ‘উপহার’ হিসেবে সমাদৃত হয়, বিচ্ছেদের সময় তা-ই অনেক ক্ষেত্রে ‘যৌতুক’ হিসেবে আদালতে দাখিল করা হয়।
একজন পারিবারিক আইন চর্চাকারী আইনজীবী হিসেবে আমি প্রায়ই দেখি, এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি না জানার কারণে অনেক পরিবার আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে। আজ আমরা জানবো, আইনগতভাবে গহনা কখন যৌতুক আর কখন শুধুই উপহার।
বিভ্রান্তি যেখানে শুরু: বিয়ের সময় বরের পক্ষ থেকে বা কনের বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে যে অলঙ্কার দেওয়া হয়, বিচ্ছেদের সময় স্বামী পক্ষ অনেক সময় দাবি করেন সেগুলো তো যৌতুক নয়, তাই ফেরত দিতে হবে! আবার কনে পক্ষ অনেক সময় উপহার হিসেবে পাওয়া গহনাকেও যৌতুক হিসেবে মামলায় উল্লেখ করেন। এই বিভ্রান্তি নিরসন হওয়া জরুরি।
আইনগত ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স
বাংলাদেশে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী গহনার অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার:
যৌতুক (Dowry): যদি বিয়ের শর্ত হিসেবে বরপক্ষ কনেপক্ষের কাছে গহনা দাবি করে এবং সেই দাবির প্রেক্ষিতে গহনা দেওয়া হয়, তবেই তা আইনত ‘যৌতুক’ হিসেবে গণ্য হবে। এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
উপহার (Gift): বিয়ের সময় বা বিয়ের মজলিসে বরপক্ষ কনেকে ভালোবেসে যে গহনা পরিয়ে দেন, সেটি আইনত ‘উপহার’ বা ‘Gift’। যৌতুক নিরোধ আইন অনুযায়ী, বিয়ের সময় কনেকে দেওয়া এই ধরণের উপহার যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে না।
গহনার মালিকানা আসলে কার?
আইন অনুযায়ী, বিয়ের সময় কনেকে দেওয়া গহনা (তা বরের পক্ষ থেকে হোক বা কনের পক্ষ থেকে) কনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ‘স্ত্রীধন’। এই গহনার ওপর কনের একক এবং নিরঙ্কুশ অধিকার থাকে। এমনকি স্বামী চাইলেও স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া এই গহনা বিক্রি বা বন্ধক রাখতে, কিছুই করতে পারেন না।
সাধারণ প্রতিকার ও পরামর্শ
১. বিয়ের সময় আদান-প্রদান করা গহনার একটি তালিকা (Inventory) তৈরি করে উভয় পক্ষের স্বাক্ষর রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। এগুলো যে উপহার হিসেবে প্রাপ্ত সেটাও পরিস্কার করুন।
২. গহনা কেনার রশিদগুলো সবসময় যত্ন করে সংরক্ষণ করুন।
৩. বিচ্ছেদের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে গহনা দাবি বা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত অবস্থান নিশ্চিত হয়ে পদক্ষেপ নিন।
বিশেষ পরামর্শ: আইন সবার জন্য সমান হলেও প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে। তাই যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন। উপরোক্ত আলোচনাটি শুধুমাত্র সাধারণ জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
সুস্থ থাকুক পারিবারিক বন্ধন, সুরক্ষিত থাকুক আপনার আইনি অধিকার।