“মেয়েটা তালাকপ্রাপ্ত, ওর সাথে মেশার দরকার নেই” – এই একটি বাক্য একজন নারীর নতুন করে বাঁচার অধিকারকে গলা টিপে হত্যা করার জন্য যথেষ্ট।
গত মাসে তানিয়া নামে একজনের সাথে কথা হচ্ছিল আমার। ডিভোর্সের পর যখন তিনি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, ঠিক সেই সময় তার নিজের আত্মীয়রাই তাকে ‘অলক্ষুণে’ তকমা দিয়ে পরিবার থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিল!
তানিয়ার অপরাধ? তিনি একটি বিষাক্ত ও সহিংস দাম্পত্য জীবন থেকে বেরিয়ে আসার সাহস দেখিয়েছিলেন। নিজের মতো করে জীবন গড়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের সমাজে আজও একজন পুরুষ ডিভোর্স নিলে তাকে ‘একা’ ভাবা হয়, কিন্তু একজন নারী ডিভোর্স নিলে তাকে ‘দোষী’ হিসেবে দেখা হয়; বিছিন্ন করা হয় পরিবার আর সমাজ থেকে।
একজন আইনজীবী হিসেবে আজ আমি তালাকপ্রাপ্ত নারীর পারিবারিক, সামাজিক ও আইনগত অবস্থান নিয়ে কিছু স্পষ্ট কথা বলতে চাই।
১. আইনগত অবস্থান: তালাক মানেই অধিকার হারানো নয় বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী একজন তালাকপ্রাপ্ত নারী মোটেই অসহায় নন।
দেনমোহর: ডিভোর্স যে পক্ষ থেকেই হোক, বকেয়া দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর আইনি বাধ্যবাধকতা। বহুবার বলেছি, দেনমোহর বিবাহের সাথে সম্পর্কিত, তালাকের সাথে বা অন্য কোনো কিছুর সাথে নয়। বিবাহ হয়েছে মানেই স্বামীর উপর দেনমোহর বাধ্যতামূলক হয়েছে।
খোরপোষ: ইদ্দতকালীন সময় (সাধারণত ৯০ দিন) পর্যন্ত স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী। গর্ভবতী হলে এসময় বেড়ে যাবে।
সন্তানের জিম্মাদারী: বিচ্ছেদের পরেও মা সন্তানের জিম্মাদারী (Custody) পাওয়ার প্রথম দাবিদার। মা সকল স্বাভাবিক অবস্থায় সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণে নিজের কাছে সন্তান রাখার অধিকার রাখেন।
২. সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান: আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি
একজন নারী যখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন, তিনি অনেক ভেবেচিন্তেই নেন। সমাজ তাকে ‘সহনশীল’ হওয়ার যে ভুল শিক্ষা দেয়, তা অনেক সময় তার জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে! পরিবারগুলোর উচিত তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকে বোঝা মনে না করে তাকে মানসিক ও আইনি সমর্থন দেওয়া। বিচ্ছেদ জীবনের শেষ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি সম্মানজনক জীবনের শুরু।
৩. সচেতনতা কেন প্রয়োজন?
আইন জানলে এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকলে কোনো নারীকেই সামাজিক হেনস্থার শিকার হতে হয় না। ডিভোর্সের পর নারীরা যাতে কর্মক্ষেত্রে বা সমাজে বুলিং-এর শিকার না হন, সেদিকে খেয়াল রাখা আমাদের প্রত্যেকের নাগরিক দায়িত্ব। আড়ালে আবডালে তাকে নিয়ে যে কথাবার্তা হয়, তার সিংহভাগ ঘুরেফিরে সেই নারীর কানে চলে আসে। এটা সকলের জানা দরকার।
আপনার জন্য পরামর্শ: আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। বিচ্ছেদের পর দেনমোহর বা সন্তানের হেফাজত নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হলে কোনো গুজবে কান না দিয়ে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।