মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে মানেই কি সন্তানের অধিকার হারানো?

মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে মানেই কি সন্তানের অধিকার হারানো?

উত্তর হচ্ছে – ‘না’।

আমাদের সমাজে একটি গভীর আতঙ্ক কাজ করে, বিশেষ করে নারীর মনে, বিচ্ছেদ হওয়া কোনো মা যদি পুনরায় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তবে তাকে বুঝি কোলের সন্তানকে ছেড়ে দিতে হবে। এই ভয়ের কারণে অনেক নারী নিজের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করা বাদ দিতেও দ্বিধাবোধ করেন। কিন্তু আইনের ব্যাখ্যা কী বলে?

বেশ কিছুদিন আগের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সংক্ষেপে বলছি সেটা।

রোকসানা নামের এক ভদ্রমহিলা ডিভোর্সের পর তার ৫ বছরের সন্তানকে নিয়ে একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একটা সময় তিনি জীবনের তাগিদে পুনরায় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। রোকসানার প্রাক্তন স্বামী তৎক্ষণাৎ আদালতে মামলা করলেন এই যুক্তিতে যে, “মা যেহেতু পুনরায় বিয়ে করেছে, তাই সন্তানের জিম্মা এখন থেকে বাবার হবার কথা।”

বিজ্ঞ আদালত যখন বিষয়টি খতিয়ে দেখলেন, তখন দেখা গেল রোকসানার বর্তমান স্বামী (সৎ বাবা) শিশুটিকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ-আদর যত্ন করছেন এবং সেখানে শিশুটির শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার পরিবেশও অত্যন্ত চমৎকার।

অন্যদিকে তার আসল বাবার পারিবারিক পরিবেশ ছিল অগোছালো। সত্যি বলতে, তিনি কিছুটা ভবঘুরে ধরণের মানুষ ছিলেন। আদালত রায় দিলেন, সন্তান মায়ের কাছেই থাকবে। কারণ, আইন এখানে মায়ের বিয়ে বা বাবার দাবীর চেয়ে শিশুর ‘মানসিক ও শারীরিক কল্যাণ’কে বড় করে দেখেছেন।

বিস্তারিত আইনগত ব্যাখ্যা:

বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন এবং The Guardians and Wards Act, 1890 অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে মা দ্বিতীয় বিয়ে করলে সন্তানের জিম্মা হারানোর ঝুঁকি থাকে। কিন্তু এটি কোনো অটোমেটিক বা স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নয়।

আদালত সর্বদা “Welfare of the Minor” বা অপ্রাপ্তবয়স্কের কল্যাণকে ‘সুপ্রিম ল’ বা সর্বোচ্চ আইন হিসেবে গণ্য করবেন। আদালত বিচার করেন:

মায়ের দ্বিতীয় স্বামী বা সৎ বাবা সন্তানটির প্রতি কেমন আচরণ করছেন?

নতুন পরিবেশে সন্তানটি মানসিকভাবে কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্য?

মায়ের কাছে থাকাটা কি সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বেশি নিরাপদ?

তার ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য, এই পরিবেশ কতটুকু উপযুক্ত? ইত্যাদি।

যদি প্রমাণিত হয় যে, সৎ বাবার ঘরেও সন্তানটি মায়ের ছায়ায় নিরাপদে এবং সুখে আছে, তবে উচ্চ আদালতের অনেক নজির অনুযায়ী মা তার সন্তানের জিম্মা রাখার পূর্ণ অধিকার রাখেন। আইন কেবল যান্ত্রিক নিয়ম নয়, বরং একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার হাতিয়ার।

মায়েদের জন্য বার্তা:

দ্বিতীয় বিয়ে করা আপনার অধিকার। আপনি যদি আপনার সন্তানকে একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ দিতে পারেন, তবে কেবল বিয়ের অজুহাতে আইন আপনাকে মাতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করবে না। সত্য গোপন না করে আইনি লড়াইয়ে সাহসী হোন। আরও একটি কথা মনে রাখা দরকার: আইন সবার জন্য এক হলেও প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও ফলাফলও ভিন্ন হতে পারে। সাধারণভাবে প্রতিকারগুলো কী হতে পারে সে সম্পর্কে এখানে আলোকপাত করা হয়েছে। সঠিক আইনি পদক্ষেপের জন্য একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করা আবশ্যক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top