স্বামী মারা গেছেন, কিন্তু দেনমোহর এখনো অনাদায়ী। আত্মীয়-স্বজন বলছেন সম্পদ ভাগ হবে, কিন্তু আপনার পাওনা দেনমোহরের কী হবে? এটি কি এখন কেবলই একটি মৃত দাবি?
আমার দেখা সাম্প্রতিক একটি ঘটনার আলোকে বলছি।
রোকসানা বেগমের স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন কদিন আগে। স্বামীর রেখে যাওয়া ঘর-বাড়ি এবং বেশ কিছু জমিজমা আছে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন এখন সেই সকল সম্পদ বণ্টনের তোড়জোড় করছেন। রোকসানা যখন তার বিয়ের সময়কার অনাদায়ী ৫ লক্ষ টাকা দেনমোহরের কথা তুললেন, তখন সবাই তাকে পরামর্শ দিলেন, “স্বামীই তো নেই, এখন আবার কিসের দেনমোহর? এখন তো তুমি উত্তরাধিকারী হিসেবে এমনিতেই সম্পদ পাবে।”
রোকসানা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। তিনি জানেন না যে, উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রাপ্ত অংশ আর দেনমোহর সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। এই অজ্ঞতার কারণে এই বাংলাদেশে অনেক বিধবা নারী তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
জানুন বিস্তারিত, স্বামী মারা গেলে অনাদায়ী দেনমোহর আদায়ের আইনি পদ্ধতিগুলো।
আইনগত ব্যাখ্যা:
১. দেনমোহর একটি অগ্রগণ্য ঋণ (Prior Debt): ইসলামি আইন এবং বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে প্রথমে তার জানাজা ও দাফন-কাফনের খরচ এবং এরপর তার যাবতীয় ‘ঋণ’ পরিশোধ করতে হয়। স্ত্রীর অনাদায়ী দেনমোহর হলো স্বামীর ওপর ‘একটি বাধ্যতামূলক ঋণ’। সুতরাং অন্যান্য ঋণের সাথে স্ত্রী এই ঋণও (অনাদায়ী দেনমোহর) পরিশোধ করতে হবে। এটাই বিধান।
২. সম্পদ বণ্টনের আগে দেনমোহর: মৃত স্বামীর সম্পদ তার উত্তরাধিকারীদের (সন্তান, মা-বাবা বা অন্যান ভাগিদার) মধ্যে বণ্টন করার আগেই স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, দেনমোহর শোধ করার পর যে সকল সম্পদ অবশিষ্ট থাকবে, তা বণ্টন হবে।
৩. উত্তরাধিকার বনাম দেনমোহর: স্ত্রী হিসেবে রোকসানা বেগম মৃত স্বামীর সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ (সন্তান থাকলে ১/৮ অংশ, না থাকলে ১/৪ অংশ) উত্তরাধিকার সূত্রে পাবেন। এই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ কখনোই তার দেনমোহরের বিকল্প নয়। তিনি দেনমোহরও পাবেন পূর্ণাঙ্গভাবে, আবার উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পদও পাবেন।
৪. সম্পত্তি দখলে রাখার অধিকার: যদি দেনমোহর অনাদায়ী থাকে এবং স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তিতে দখলে থাকেন, তবে দেনমোহর পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেই সম্পত্তি দখলে রাখার অধিকার রাখেন (যাকে আইনি ভাষায় Right of Retention বলা হয়)। নারীদের প্রতি আমার বিশেষ বার্তা: স্বামীর মৃত্যু আপনার আইনি অধিকারকে শেষ করে দেয় না। শোকের এই সময়ে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা আপনার ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। মনে রাখবেন, এটি কোনো করুণা নয়, আপনার প্রাপ্য মর্যাদা। যা বাংলাদেশের আইন ও ইসলামি ফারায়েজ থেকে এসেছে।