স্বামী হাতখরচ দেন না, এটা কি অর্থনৈতিক সহিংসতা?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “স্বামী হাতখরচ দেন না, এটা কি অর্থনৈতিক সহিংসতা?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, আমরা সাধারণত সহিংসতা বলতে কেবল মারধর বা শারীরিক নির্যাতনকে বুঝি। কিন্তু আইনের চোখে ‘সহিংসতা’ কেবল শরীরে সীমাবদ্ধ নয়। স্বামী যদি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীকে প্রয়োজনীয় হাতখরচ বা ভরণপোষণ না দেন, তবে সেটি অবশ্যই অর্থনৈতিক সহিংসতা হিসেবে গণ্য হবে।

১. পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন কী বলে?

বাংলাদেশে প্রচলিত ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’-এর ৩ ধারায় পারিবারিক সহিংসতার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই আইনের ৩(ঘ) উপধারা অনুযায়ী, ‘আর্থিক ক্ষতি’ পারিবারিক সহিংসতার অন্তর্ভুক্ত।

এর মানে হলো:

  • স্ত্রীকে তার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা বা ব্যক্তিগত খরচের টাকা থেকে বঞ্চিত করা।
  • স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদ বা তার উপার্জিত অর্থ তাকে ভোগ করতে না দেওয়া।
  • স্ত্রীর মৌলিক চাহিদা (খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা) পূরণে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করা।

২. হাতখরচ কি কেবল করুণা?

না। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে কোনো করুণা বা দয়া নয়। মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর ভরণপোষণ (Maintenance) প্রদান করা স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক (Mandatory)। হাতখরচ সেই ভরণপোষণেরই একটি অংশ। স্বামী যদি স্ত্রীকে খাবার ও বাসস্থান দিয়ে ভাবেন তার দায়িত্ব শেষ, তবে তিনি ভুল ভাবছেন। স্ত্রীর সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় খরচ দেওয়া স্বামীর আইনি দায়িত্ব।

৩. কখন এটি সহিংসতা হিসেবে বড় আকার ধারণ করে?

যখন স্বামী স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করার অস্ত্র হিসেবে টাকা-পয়সা বন্ধ করে দেন, অর্থাৎ টাকা না দিয়ে স্ত্রীকে মানসিকভাবে চাপের মুখে রাখা বা তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে হীনম্মন্যতায় ভোগানো, তখন এটি গুরুতর অর্থনৈতিক অপরাধ ও সহিংসতা।

৪. আইনি প্রতিকার কী?

যদি কোনো স্ত্রী এই ধরনের অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হন, তবে তিনি নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:

পারিবারিক আদালতে মামলা: ভরণপোষণ ও হাতখরচ আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করা যায়।

সুরক্ষা আদেশ: পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইনে স্ত্রী আদালতের কাছে ‘সুরক্ষা আদেশ’ চাইতে পারেন, যাতে স্বামী তাকে আর্থিক কষ্ট দিতে না পারেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট: স্থানীয় প্রশাসন বা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ জানিয়েও দ্রুত প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

৫. স্বামীর সামর্থ্য ও বাস্তবতা

তবে আইনের একটি দিক হলো, আদালত সবসময় স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে। স্বামী যদি নিজেই বেকার বা চরম দরিদ্র হন, তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও টাকা না দেওয়া স্পষ্টতই আইন লঙ্ঘন।

পরিশেষে, সম্মানজনক জীবনযাপন করা একজন স্ত্রীর আইনগত অধিকার। টাকার অভাব দেখিয়ে বা স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে হাতখরচ বন্ধ করা কেবল অমানবিক নয়, এটি প্রচলিত আইনে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।

Share the Post:
Scroll to Top