সংসারজুড়ে বিশ্বাস আর ভালোবাসার যে দেওয়ালটি আপনি এত বছর ধরে আগলে রেখেছিলেন, তা যদি হঠাৎ করেই স্বামীর একটি গোপন বিয়ের খবরে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তবে ভেঙে পড়বেন না। বাংলাদেশে প্রচলিত আইন আপনার পাশে আছে। আইন না জানার কারণে অনেক নারীই এই পরিস্থিতিতে চরম মানসিক ও সামাজিক ওলটপালটের মধ্য দিয়ে যান এবং মুখ বুজে কষ্ট সহ্য করেন।
কিন্তু আইন আপনাকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পূর্ণ অধিকার দিয়েছে।
একটি বাস্তব প্রেক্ষাপট:
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, স্বামী প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে গোপনে আরেকটি বিয়ে করে বসেন। প্রথম স্ত্রী যখন বিষয়টি জানতে পারেন, তখন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কোথায় যাবেন, কার কাছে বিচার চাইবেন, কিংবা আইনত তার কী কী সুবিধা পাওয়ার কথা, তা বুঝতে না পেরে অনেকেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। মনে রাখবেন, গোপনে বা অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা বাংলাদেশে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আইনগত ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স:
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের (Muslim Family Laws Ordinance, 1961) ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি এবং স্থানীয় সালিসি পরিষদের লিখিত অনুমোদন ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
স্বামী যদি এই নিয়ম অমান্য করে গোপনে বিয়ে করেন, তবে একজন প্রথম স্ত্রী হিসেবে আপনি প্রধানত তিনটি আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন:
১. ফৌজদারি মামলা (শাস্তির বিধান): উক্ত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া বিয়ে করার অপরাধে আপনি আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে পারেন। অপরাধ প্রমাণিত হলে স্বামীর ১ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড (কিংবা উভয় দণ্ড) হতে পারে। পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৪৯৪/৪৯৫ ধারা অনুযায়ীও ‘দ্বি-বিবাহ’ বা ‘Bigamy’-এর অভিযোগে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
২. তাৎক্ষণিক দেনমোহর দাবি: একই আইনের ৬(৫)(এ) ধারা অনুযায়ী, স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার সাথে সাথেই আপনার বকেয়া দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা (তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত – উভয় অংশই) পরিশোধ করতে বাধ্য। তিনি যদি তা না দেন, তবে আপনি পারিবারিক আদালতে মামলা করে আপনার সম্পূর্ণ দেনমোহর আদায় করতে পারবেন।
৩. পৃথক খোরপোশ ও ভরণপোষণ: স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলেও আপনার খোরপোশ পাওয়ার অধিকার বিন্দুমাত্র কমে না। আপনি যদি স্বামীর সাথে একই ছাদের নিচে থাকতে না চান, তবে পৃথক থেকেও আপনার এবং আপনার সন্তানদের ভরণপোষণের টাকা দাবি করে পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। এমনকি এটি ডিভোর্সের একটি অন্যতম বৈধ কারণ হিসেবেও গণ্য হতে পারে।
আইনজীবীর পরামর্শ: অন্যায়কে মুখ বুজে সহ্য করা অপরাধীর সাহস আরও বাড়িয়ে দেয়। স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করলে আবেগের বশে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত না নিয়ে শান্ত থাকুন। বিয়ের কাবিননামা, দ্বিতীয় বিয়ের ছবি বা প্রমাণপত্র সংগ্রহ করুন এবং একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হয়ে সঠিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু করুন।