কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম, বিয়ে ভাঙার ভয় নাকি নারীর আইনি সুরক্ষা?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম, বিয়ে ভাঙার ভয় নাকি নারীর আইনি সুরক্ষা?” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল

“মেয়ের বিয়েতে কোটি টাকার দেনমোহর চাইলেন, অথচ কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরটি কেটে ‘না’ লিখে দিলেন, জানেন কি, অজান্তেই আপনার মেয়ের ভবিষ্যৎ কতটা ঝুঁকিতে ফেলে দিলেন?”

আমাদের সমাজে একটা খুব সাধারণ কিন্তু মারাত্মক ভুল ধারণা আছে। অনেকেই মনে করেন, কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার বা ‘তালাক ই তৌফিজ’ দিলে সংসার টিকবে না, মেয়ে সামান্য ঝগড়াতেই সংসার ভেঙে চলে যাবে। এই ভয়ে বিয়ের আসরে কাজী সাহেব যখন জিজ্ঞেস করেন, তখন বরের অভিভাবক বা অনেক সময় কনের অভিভাবকরাও তাড়াহুড়ো করে এই ঘরটি কেটে দেন বা ‘না’লিখে দেন।

একজন পারিবারিক আইন আইনজীবী হিসেবে প্রতিদিন এমন অনেক নারীর মুখোমুখি আমাকে হতে হয়, যারা এই একটি ভুলের কারণে বছরের পর বছর নরকযন্ত্রণা সহ্য করছেন, কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে সহজে মুক্তি পাচ্ছেন না।

চলুন জেনে নেয়া যাক, এ ব্যাপারে আইন কী বলছে?

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ (The Muslim Family Laws Ordinance, 1961) অনুযায়ী, নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামের মাধ্যমে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করতে পারেন। মুসলিম আইনে একে বলা হয় ‘তালাক ই তৌফিজ’।

এখানে মনে রাখা জরুরি, এই অধিকার পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, স্ত্রীর বিয়ে ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা একচ্ছত্র হয়ে গেল। স্বামী যেভাবে তালাক দিতে পারেন, স্ত্রীকেও ঠিক একই আইনি ক্ষমতা দেওয়া হলো মাত্র। স্বামী তার নিজের তালাক দেওয়ার আইনি অধিকার কিন্তু হারাচ্ছেন না।

এই কলামটি কেটে দেওয়া বা ফাঁকা রাখার আইনি ঝুঁকিগুলো কী?

১. আদালতের দীর্ঘমেয়াদি চক্কর: যদি কোনো কারণে সংসার এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে স্বামীর চরম নির্যাতন, মাদকাসক্তি বা নিখোঁজ হওয়ার কারণে কনের পক্ষে আর একসাথে থাকা সম্ভব নয়, তখন ১৮ নম্বর কলামে ‘হ্যাঁ’ লেখা থাকলে স্ত্রী কাজী অফিসে গিয়ে সহজেই আইনি বিচ্ছেদ সম্পন্ন করতে পারেন।

কিন্তু এই ঘরটি কাটা থাকলে, তাকে ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন (The Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939) অনুযায়ী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হবে। একটি ডিক্রি পেতে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হতে পারে।

২. প্রমাণের কঠিন দায়: আদালতে মামলা করে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে হলে স্বামীকে খোঁড়া বা নপুংসক প্রমাণ করা, চার বছর নিখোঁজ থাকা কিংবা নিষ্ঠুরতার অকাট্য প্রমাণ হাজির করতে হয়, যা মানসিকভাবে চরম বেদনাদায়ক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

৩. অধিকার খর্ব হওয়া: এই ঘরটি কেটে দেওয়ার অর্থ হলো, চরম বিপদের মুহূর্তে একজন নারীর নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার আইনি পথটি বন্ধ করে দেওয়া।

আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ:

মনে রাখা জরুরি, ১৮ নম্বর কলামটি কোনো ‘তালাকের লাইসেন্স’নয়, এটি মূলত একটি ‘সেফটি ভালভ’ বা সুরক্ষাকবচ। একটি সুস্থ ও পারস্পরিক বিশ্বাসের সংসারে এই ধারাটি কখনোই ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু জীবন অনিশ্চিত। যে মেয়েটিকে আপনি এত যত্ন করে বড় করলেন, তার ভবিষ্যতের আইনি সুরক্ষার চাবিকাঠি বিয়ের আনন্দের আতিশয্যে কেটে বাদ দেবেন না।

বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আবেগের পাশাপাশি আইনি সচেতনতাও জরুরি। সচেতন হোন, সুরক্ষিত থাকুন। মনে রাখবেন, আপনি যতটা আবেগ আর ভালোবাসা দিয়ে বিয়েকে বিবেচনা করুন না কেন, দিনের শেষে মুসলিম বিবাহ একটি দেওয়ানি চুক্তি মাত্র!

Share the Post:
Scroll to Top