তালাকের সময় গহনা নিয়ে আপোষনামা। কেন ও কীভাবে করবেন?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “তালাকের সময় গহনা নিয়ে আপোষনামা। কেন ও কীভাবে করবেন?” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল

“আমরা মুখে মুখে সব মিটমাট করে আলাদা হয়ে গিয়েছি, তাহলে আবার কেন গহনা চুরির বা যৌতুকের মামলা হলো?”- পারিবারিক আদালতে এমন আক্ষেপ প্রায়ই শোনা যায়। অনেক দম্পতি বিচ্ছেদের সময় দেনমোহর বা গহনা আদান-প্রদান মুখে মুখে বা সাধারণ একটা কাগজে সই করে চুকিয়ে ফেলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো এক পক্ষ নিয়ত বদলে ফেললে শুরু হয় নতুন আইনি হয়রানি।

একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া এমনিতেই কষ্টের, তার ওপর আইনি জটিলতার দীর্ঘসূত্রতা জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। আজ আমরা জানবো, বিচ্ছেদের সময় গহনা সংক্রান্ত বিরোধ কীভাবে আইনি উপায়ে আজীবনের জন্য নিষ্পত্তি করা যায়।

মৌখিক বা কাঁচা লেখার ফাঁদ:

অনেক সময় তালাকের পর দুই পরিবার মিলে বসে গহনা বা অন্যান্য জিনিসপত্র বুঝিয়ে দেয়। কোনো লিখিত প্রমাণ না থাকায়, কিংবা অদক্ষ হাতে কোনো সাদা কাগজে ‘বুঝে পাইলাম’ লিখে রাখায় পরবর্তীতে আইনি লড়াইয়ে তা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়। ফলে বিচ্ছেদের কয়েক মাস বা বছর পার হওয়ার পরও দেখা যায় গহনা আত্মসাৎ বা যৌতুকের মিথ্যা মামলার নোটিশ চলে এসেছে।

আইনগত ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স

বাংলাদেশে প্রচলিত পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এবং চুক্তি আইন (Contract Act, 1872) অনুযায়ী যেকোনো দেনা-পাওনার একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি থাকা জরুরি:

আপোষনামা বা ডিড অব সেটলমেন্ট (Deed of Settlement): তালাক কার্যকর করার সময় বা তার পূর্বে উভয় পক্ষ যদি দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং গহনা আদান-প্রদানের বিষয়টি একটি লিখিত চুক্তিতে রূপ দেয়, তবে তাকে ‘আপোষনামা’ বলে।

আইনি গ্রহণযোগ্যতা: চুক্তি আইনের বিধান অনুযায়ী, আইনসম্মত উদ্দেশ্যে এবং উভয় পক্ষের স্বেচ্ছায় করা চুক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ। যখন এই আপোষনামা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখে রেজিস্ট্রি করা হয় বা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সত্যায়িত করা হয়, তখন এর আইনি শক্তি বহুলাংশে বেড়ে যায়। এটি ভবিষ্যতে নতুন কোনো মামলার পথ বন্ধ করে দেয়।

আপোষনামা তৈরির সময় যে খুটিনাটি বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন –

১. বিস্তারিত তালিকা (Inventory): কোন পক্ষ কোন গহনা (কত ভরি, কী রঙ, মেমো আছে কি না) ফেরত দিচ্ছে বা বুঝে পাচ্ছে, তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে।

২. মূল্য নির্ধারণ: কোনো গহনা যদি হারিয়ে গিয়ে থাকে বা নষ্ট হয়ে থাকে, তবে তার পরিবর্তে সমমূল্যের টাকা পরিশোধ করা হলে তা রসিদসহ চুক্তিতে লিখতে হবে।

৩. চূড়ান্ত ঘোষণা: চুক্তিতে স্পষ্টভাবে লিখতে হবে যে — (উদাহরণ) “আজকের পর থেকে গহনা বা অলঙ্কার সংক্রান্ত বিষয়ে এক পক্ষের অন্য পক্ষের প্রতি আর কোনো দাবি বা অভিযোগ থাকবে না এবং এই বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো মামলা করা যাবে না।”

৪. সাক্ষী: উভয় পক্ষের বিশ্বস্ত এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এই আপোষনামায় সাক্ষী হিসেবে রাখতে হবে।

সাধারণ প্রতিকার ও পরামর্শ: বিচ্ছেদ বা তালাক এমনিতেই একটি জটিল প্রক্রিয়া। তাই গহনা বা দেনমোহর বুঝিয়ে দেওয়ার সময় শুধু ‘বিশ্বাস’-এর ওপর ভরসা না করে সবকিছু লিখিত আকারে সম্পন্ন করুন। তালাক বা আপোষনামার নোটিশটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কার্যালয়ে পাঠানো নিশ্চিত করুন।

বিশেষ পরামর্শ: আইন সবার জন্য এক হলেও প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও আপোষনামার শর্তাবলীর আইনি ড্রাফটিংও ভিন্ন হবে। ভবিষ্যতে যেকোনো বড় আইনি ঝুঁকি এড়াতে এই ধরণের আপোষনামা বা চুক্তিপত্র তৈরির সময় একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। উপরোক্ত আলোচনায়, সাধারণভাবে প্রতিকারগুলো কী কী হতে পারে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হল।

Share the Post:
Scroll to Top