প্রিয় পাঠক, দাম্পত্য জীবনে ‘খোরপোশ’ বা ‘ভরণপোষণ’ কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি স্ত্রীর একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি অধিকার। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং ধর্মীয় বিধান এই বিষয়ে কী বলে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. আইনি বাধ্যবাধকতা
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, বিয়ের পর স্ত্রীর ভরণপোষণ বা খোরপোশ জোগানো স্বামীর জন্য আইনত বাধ্যতামূলক। স্বামী ধনী হোন বা দরিদ্র, তিনি তার সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে খোরপোশ দিতে বাধ্য। স্ত্রী যদি বিত্তবানও হন এবং স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করেন, তবুও স্বামী তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবেন না।
২. খোরপোশ কখন দিতে হয়?
ভরণপোষণ মূলত তিনটি অবস্থায় বাধ্যতামূলক:
দাম্পত্য জীবন চলাকালীন: স্বামী-স্ত্রী একত্রে বসবাস করার সময় স্ত্রীর যাবতীয় মৌলিক চাহিদা (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা) স্বামী পূরণ করবেন।
স্ত্রী আলাদা থাকলেও: যদি স্বামী স্ত্রীকে মারধর করেন, সংক্রামক ব্যাধি আক্রান্ত হন, স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেন, কিংবা স্ত্রী যদি কোনো ন্যায়সংগত কারণে (যেমন- স্বামী অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত বা দেনমোহর পরিশোধ করছেন না, ইত্যাদি) আলাদা থাকেন, তবে স্বামী তাকে খোরপোশ দিতে বাধ্য।
তালাক পরবর্তী সময়: তালাক কার্যকর হওয়ার পর ইদ্দতকালীন সময় পর্যন্ত (সাধারণত ৯০ দিন বা সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত) স্বামী স্ত্রীকে খোরপোশ দেবেন।
৩. খোরপোশ না দিলে আইনি প্রতিকার
যদি স্বামী খোরপোশ না দেন, তবে স্ত্রী দুটি উপায়ে প্রতিকার পেতে পারেন:
পারিবারিক আদালত: স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে বকেয়া এবং চলমান খোরপোশ দাবি করতে পারেন। আদালত স্বামীর আয় ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে মাসিক একটি অংক নির্ধারণ করে দেন। বর্তমানে জেলার লিগ্যাল এইড অফিসে অভিযোগ দায়ের করতে হবে।
স্থানীয় সালিসি পরিষদ: ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেও ভরণপোষণ আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
৪. খোরপোশ কি কেবল স্ত্রীর জন্য?
না। বাবার সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানদের ভরণপোষণ দেওয়াও তার আইনি বাধ্যবাধকতা। এমনকি ডিভোর্সের পর সন্তান যদি মায়ের কাছেও থাকে, তবুও সন্তানদের প্রাপ্তবয়স্ক (ছেলেদের ক্ষেত্রে) বা বিয়ে (মেয়েদের ক্ষেত্রে) না হওয়া পর্যন্ত বাবা তাদের খরচ দিতে বাধ্য।
৫. স্বামী কখন খোরপোশ দিতে বাধ্য নন?
এ সম্পর্কে পরবর্তিতে আলোচনা করা হবে। পেজে লক্ষ্য রাখুন।
গুরুত্বপূর্ণ: খোরপোশ কোনো দয়া বা দান নয়, এটি স্ত্রীর আইনগত প্রাপ্য। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীরা খোরপোশ না দিয়ে স্ত্রীকে অবহেলা করেন, যা দণ্ডনীয় অপরাধ। পারিবারিক শান্তি রক্ষায় এবং আইনি জটিলতা এড়াতে স্বামীর উচিত স্ত্রীর এই অধিকার যথাযথভাবে সম্মান করা।