রাগের মাথায় তালাক বললে কি তালাক হয়?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “রাগের মাথায় তালাক বললে কি তালাক হয়?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, রাগের মাথায় উচ্চারিত তালাক নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক বিভ্রান্তি আছে। আইন এবং বাস্তবতা কী বলে, তা সবার স্পষ্টভাবে জানা উচিত।

১. আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তালাক অকার্যকর

বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (The Muslim Family Laws Ordinance, 1961) অনুযায়ী, কেবল মুখে ‘তালাক’ বললেই আইনিভাবে তালাক কার্যকর হয় না।

তালাক কার্যকর করার জন্য আইনগত শর্ত হলো, যে পক্ষ তালাক দিচ্ছেন, তাকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট স্থানীয় চেয়ারম্যান/মেয়রকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং অপর পক্ষকে তার অনুলিপি পাঠাতে হবে। রয়েছে আরও কিছু নির্দেশনা।

যতক্ষণ না এই আইনি প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, ততক্ষণ কেবল মুখে রাগের মাথায় ১০০ বার তালাক বললেও আইনত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয় না।

২. শরিয়াহ আইনের দৃষ্টিভঙ্গি

শরিয়াহ আইনে রাগের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।

যদি রাগ এমন পর্যায়ের হয় যে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায় (অর্থাৎ পাগলপ্রায় অবস্থা), তবে অনেক আলেমদের মতে সেই তালাক গণ্য হয় না।

তবে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, রাগের মাথায় তালাক দিলে তা সংঘটিত হয় বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ‘রাজয়ী তালাক’ বা পুনরায় ফিরে পাওয়ার সুযোগ থাকে যদি সেটি প্রথম বা দ্বিতীয়বার হয়। (শরিয়ার কথা বলা আমার কাজ নয়, সে যোগ্যতাও আমার নেই। শুধু আলোচনার প্রয়োজনে বইপত্র থেকে কিছু কথা পড়ে এখানে লিখলাম)।

৩. মৌখিক তালাকের সামাজিক কুফল

যদিও আইনত মুখে তালাক বললে সম্পর্ক শেষ হয় না, তবুও এটি সামাজিকভাবে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। অনেক সময় হিল্লা বিয়ের মতো কুসংস্কার বা সামাজিকভাবে একঘরে করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং মুখে এমন শব্দ উচ্চারণ না করা জরুরি।

৪. ভুল সংশোধন বা আপস-মীমাংসা

রাগের মাথায় কেউ তালাক বলে ফেললে এবং পরে যদি তারা পুনরায় সংসার করতে চান:

যেহেতু বাংলাদেশে কেবল মুখের কথায় তালাক আইনিভাবে স্বীকৃত নয়, তাই তারা চাইলে কোনো নতুন বিয়ে ছাড়াই একত্রে বসবাস করতে পারেন।

তবে যদি নোটিশ দেওয়া হয়ে থাকে, তবে ৯০ দিনের সময়সীমা পার হওয়ার আগে যেকোনো সময় সেই নোটিশ প্রত্যাহার করা যায়।

৫. আদালতের পর্যবেক্ষণ

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন মামলায় পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেবল মুখের কথার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। তালাকের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট কারণ এবং আইনগত পদ্ধতির অনুসরণ বাধ্যতামূলক।

সহজ কথায়, রাগের মাথায় মুখ দিয়ে তালাক বললেই আপনার সংসার ভেঙে যায় না, আইনিভাবে তারা তখনও স্বামী-স্ত্রী থাকেন। তবে এই ধরণের আচরণ সম্পর্কের বিশ্বাস ও ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। তাই রাগের মুহূর্তে কথা বলার চেয়ে চুপ থাকাই শ্রেয়।

গুরুত্বপূর্ব বিষয় হলো, ইসলামে তালাককে একটি বৈধ কাজ হলেও তা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়। হাদিসে একে “সর্বনিকৃষ্ট হালাল” বা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল কাজ বলা হয়েছে (আবু দাউদ: ২১৭৭)। দাম্পত্য জীবনে চরম অশান্তি বা অসম্ভবের পর্যায়ে না পৌঁছালে এ থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। বলা হয়ে থাকে এটি শয়তানের প্রিয় কাজ এবং পারিবারিক কাঠামো ভেঙে দিয়ে সমাজকে বিনষ্ট করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রশ্নটি আমার এই পেজে করেছিলাম কয়েকদিন আগে। খুবই আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম, সিংহভাগ মানুষই ব্যাপারটাকে অত্যন্ত হালকাভাবে নিয়েছেন এবং প্রায় সকলই উল্টো আমাকেই প্রশ্ন করেছেন, ‘তালাককি কেউ হাসি মুখে দেয়?’ আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, ‘রাগের মাথায় তালাক বলা’ নিয়ে শরিয়াহ আইনে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে। আপনারা দেখে নিবেন, প্লিজ।

Share the Post:
Scroll to Top