প্রিয় পাঠক, কয়েকদিন আগে উপরোক্ত প্রশ্নটি করেছিলাম। আপনারা অনেকেই জানতে চেয়েছেন সঠিক উত্তরটি। কেহ কেহ অবশ্য ইতিমধ্যে প্রশ্নের নিচে সঠিক উত্তরটি দিয়ে দিয়েছেন। যারা সঠিক উত্তর দিয়েছেন ও যারা দিতে পারেননি, এবং যে সকল পাঠক উত্তরটি জানতে চেয়েছেন তাদের সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন।
নিঃসন্তান দম্পতিরা অনেক সময়ই পরম যত্ন-মমতায় ’অন্যোর সন্তান’ নিজের সন্তান হিসেবে লালন-পালন করেন। যাকে সাধারণত পালক সন্তান বলা হয়। কিন্তু সেই সন্তানটি কি বড় হয়ে বাবা-মায়ের সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকারী হতে পারে? চলুন বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।
১. আইনি স্বীকৃতি ও উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম আইন অনুযায়ী, ‘পালক গ্রহণ’ [Foster Child]-এর কোনো আইনগত স্বীকৃতি নেই। অর্থাৎ, আপনি যদি কাউকে পালক হিসেবে গ্রহণ করেন, তবে সে আপনার রক্তের সম্পর্কের সন্তানের মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে না। পালক নেওয়াকে আমাদের দেশে কেবল ‘লালন-পালন’ বা ‘অভিভাবকত্ব’ হিসেবে দেখা হয়, যা উত্তরাধিকারের পথ প্রশস্ত করে না।
২. মুসলিম আইনের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি শরিয়াহ এবং বাংলাদেশের মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, পালক সন্তান তার পালক বাবা-মায়ের সম্পত্তির কোনো অংশ (উত্তরাধিকার সূত্রে) পায় না। সম্পত্তির অংশ পেতে হলে রক্তের সম্পর্ক বা বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা বাধ্যতামূলক। তবে এই সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বাবা-মা চাইলে বিকল্প পথ বেছে নিতে পারেন।
৩. সম্পত্তি দেওয়ার বিকল্প আইনি পথ
পালক সন্তানকে যদি আপনি সম্পত্তির মালিক করতে চান, তবে আপনাকে তার জীবদ্দশায় নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে হবে:
হেবা বা দান (Hiba): আপনি আপনার সম্পত্তির কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ দলিল করে পালক সন্তানকে দান করে দিতে পারেন। এটি করলে সে আমৃত্যু সেই সম্পত্তির মালিক থাকবে।
অসিয়ত (Will): আপনি চাইলে আপনার মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩ অংশ (তিন ভাগের এক ভাগ) পালক সন্তানের নামে অসিয়ত বা উইল করে যেতে পারেন। তবে ১/৩ অংশের বেশি অসিয়ত করতে হলে অন্যান্য বৈধ ওয়ারিশদের অনুমতির প্রয়োজন হয়।
সাফ-কবলা বিক্রয় (বিকল্প ও সবথেকে গ্রহণযোগ্য উপায়): আপনি চাইলে আপনার সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে পালক সন্তানের কাছে বিক্রি করে দলিল করে দিতে পারেন।
৪. হিন্দু আইনের প্রেক্ষাপট
হিন্দু আইনে পালক বা দত্তক নেয়ার প্রথা (Dattaka) স্বীকৃত থাকলেও, তার জন্য নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। যদি যথাযথ নিয়ম মেনে দত্তক নেওয়া হয়, তবে সেই সন্তান উত্তরাধিকার লাভ করতে পারে। তবে সাধারণ লালন-পালন বা মৌখিক পালক গ্রহণ কোনো আইনি অধিকার তৈরি করে না।
৫. জন্মদাতার সম্পত্তিতে অধিকার
একটি মজার তথ্য হলো, পালক সন্তান যেহেতু পালক বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার পায় না, তাই আইনের চোখে সে তার জন্মদাতা (আসল) বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবেই গণ্য হয়। অর্থাৎ, পালক পিতার উত্তরাধিকার চলে গেলেও, তার আসল পরিচয় ও রক্তের সম্পর্কের উত্তরাধিকার ছিন্ন হয় না।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: পালক সন্তান ও দত্তক সন্তানের মধ্যে কিছু সুনিদির্ষ্ট পার্থক্য রয়েছে, সেটাও জানানো দরকার।
পালক সন্তান ও দত্তক সন্তানের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো স্থায়িত্ব এবং আইনি অধিকার। দত্তক সন্তান [Adoption] আইনত ও স্থায়ীভাবে নতুন পরিবারের অংশ হয় এবং জন্মসন্তানের সব অধিকার পায়। অন্যদিকে, পালক সন্তান [Foster Child] সাময়িকভাবে লালন-পালন করা হয়, যার আইনি অভিভাবকত্ব পালক পিতামাতার কাছে পুরোপুরি থাকে না। ব্যাখ্যাটি অন্যান্য ধর্মের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মুসলিম ধর্মে পালক সন্তান ও দত্তক সন্তানের কোনটিরও কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ: ইসলাম ধর্মে অন্যের সন্তান বা এতিম শিশুকে লালন-পালন করতে অত্যন্ত উৎসাহিত করা হয়েছে এবং একে সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। এমনকি, এতিম শিশুর দায়িত্ব নেওয়া বা লালন-পালন করাকে, হাদিসে জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইসলামের বিধান অনুযায়ী লালন-পালন করা বা দত্তক নেয়া সন্তানকে নিজের বংশপরিচয় দেওয়া বা বংশসূত্রে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করা যাবে না, তাদের আসল পিতৃপরিচয় বজায় রাখতে হবে। এটাই বিধান।