সন্তান আপনার সম্পত্তি নয়! জিম্মাদারি মানে কেবলই লালন-পালনের দায়িত্ব

আইন সহায়িকা ব্যানার। “সন্তান আপনার সম্পত্তি নয়! জিম্মাদারি মানে কেবলই লালন-পালনের দায়িত্ব” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল

বিচ্ছেদের পর অনেক বাবা বা মায়ের মধ্যে একটা জেদ কাজ করে – “যেকোনো মূল্যে সন্তানকে আমার কাছেই রাখতে হবে, ও শুধু আমার!”

অনেকেই মনে করেন, আদালতের মাধ্যমে সন্তানের জিম্মাদারি (Custody) বা ‘হিজানাত’ পেয়ে যাওয়া মানে সন্তানটির ওপর একক মালিকানা পেয়ে যাওয়া। অপর পক্ষকে সন্তানের ছায়া পর্যন্ত মাড়াতে না দেওয়াকে তারা নিজেদের অধিকার ভাবেন।

পারিবারিক আইন চর্চাকারী হিসেবে প্রতিদিন এমন অসংখ্য বাবা-মায়ের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে। কিন্তু আইন কি আসলেই কোনো মা বা বাবাকে সন্তানের ‘মালিকানা’ দেয়?

উত্তর হচ্ছে: না, একেবারেই না।

আইনের চোখে সন্তান কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নয় যে তার ওপর কারও মালিকানা থাকবে। মুসলিম পারিবারিক আইন এবং বাংলাদেশের প্রচলিত অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন (The Guardians and Wards Act, 1890) অনুযায়ী, জিম্মাদারি হলো কেবলই সন্তানকে সাময়িকভাবে নিজের কাছে রেখে লালন-পালন করার একটি পবিত্র দায়িত্ব।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধারণাটি হলো—”Welfare of the Child” বা “সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ”।

আমাদের দেশের উচ্চ আদালতের একাধিক নজির বা ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট রয়েছে, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে: সন্তান কার কাছে থাকবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মা বা বাবার অধিকারের চেয়ে “সন্তানের কল্যাণ ও নিরাপত্তা” সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়।

আইন অন্ধের মতো শুধু মা বা বাবার দাবি দেখে না; আদালত দেখে –

  • সন্তান কার কাছে থাকলে মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে?
  • কার কাছে তার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি নিরাপদ?
  • কার পরিবেশ সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত?

এমনকি মুসলিম আইনে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মায়ের কাছে সন্তানের থাকার অধিকার (হিজানাত) থাকলেও, যদি প্রমাণিত হয় যে মায়ের কাছে থাকলে সন্তানের ক্ষতি হতে পারে, তবে আদালত সেই অধিকার পরিবর্তন করে বাবার জিম্মাদারিতেও সন্তানকে দিতে পারেন। একইভাবে, বাবা আইনগত অভিভাবক হলেও সন্তানের ক্ষতি হলে তিনি জিম্মাদারি পাবেন না।

বিশেষ পরামর্শ: বিচ্ছেদ বা পারিবারিক টানাপোড়েন মা-বাবার মধ্যে হতেই পারে, কিন্তু তার বলি যেন নিষ্পাপ সন্তানটি না হয়। জিম্মাদারি কোনো যুদ্ধ জয়ের ট্রফি নয়, এটি একটি গুরুদায়িত্ব। আইনকে জেদ পূরণের হাতিয়ার না বানিয়ে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভাবুন।

Share the Post:
Scroll to Top