বিয়ের পর অনেক সংসারে একটি সাধারণ কিন্তু তিক্ত বিবাদের বিষয় হলো গহনা। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন মনে করেন, যেহেতু গহনাগুলো তারা দিয়েছেন, তাই এর ওপর অধিকারও তাদের। অনেক সময় দেখা যায়, স্ত্রীর অমতেই গহনা বিক্রি করে দেওয়া হয় বা লকারে আটকে রাখা হয়।
একজন আইনজীবী হিসেবে প্রতিনিয়ত এমন ঘটনার সম্মুখীন হই, যেখানে বিচ্ছেদের সময় গহনা নিয়ে শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। কিন্তু আইন এ বিষয়ে কী বলে? আজ এই বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক।
আসুন, ‘অধিকার বনাম দখল’ সম্পর্কে একটু ধারণা নেয়া যাক-
বিয়ের সময় পাওয়া গহনাগুলো যখন বিপদের দিনে স্ত্রী দিতে রাজি হন না, বা স্বামী জোর করে নিয়ে নেন, তখন থেকেই সম্পর্কের ফাটল শুরু হয়। অনেকেই জানেন না যে, গহনা কার দখলে আছে তার চেয়ে বড় বিষয় হলো আইনত এর মালিক কে? মালিকানা পরিষ্কার না থাকায় আইনি লড়াইয়ে অনেক পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
আইনগত ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স
বাংলাদেশে প্রচলিত আইন এবং ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী গহনার মালিকানা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট:
স্ত্রীধন (Stridhan) বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি: মুসলিম এবং হিন্দু উভয় আইন অনুযায়ী, বিয়ের সময় কনেকে দেওয়া গহনা (তা যে পক্ষই দিক না কেন) কনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। একে আইনগত ভাষায় ‘স্ত্রীধন’ বলা হয়।
মালিকানা: এই গহনার ওপর কনের একক এবং নিরঙ্কুশ অধিকার থাকে। এটি কোনোভাবেই স্বামীর বা শ্বশুরবাড়ির যৌথ সম্পত্তি নয়।
দান বা হেবা: বরের পক্ষ থেকে যখন কনেকে গহনা পরিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেটি একটি ‘পূর্ণাঙ্গ দান’ হিসেবে গণ্য হয়। একবার দান সম্পন্ন হয়ে গেলে দাতা (স্বামী পক্ষ) আইনত সেই সম্পত্তি আর ফেরত পাওয়ার দাবি করতে পারেন না।
গহনা নিয়ে বিরোধের আইনি প্রতিকার
যদি কোনো স্বামী বা তার পরিবার স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া গহনা নিয়ে নেয় বা বিচ্ছেদের পর ফেরত দিতে অস্বীকার করে, তবে আইনত নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব:
১. ফৌজদারি প্রতিকার: স্ত্রীর গহনা আত্মসাৎ করা ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ’ (Criminal Breach of Trust) হিসেবে গণ্য হতে পারে, যার প্রতিকার দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারায় রয়েছে।
২. পারিবারিক আদালত: পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ অনুযায়ী গহনা বা এর সমমূল্য উদ্ধারের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করা যায়।
৩. যৌতুক নিরোধ আইন: যদি গহনা ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে কোনো অনৈতিক দাবি করা হয়, তবে সেখানে সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগ হতে পারে।
সাধারণ পরামর্শ: বিবাদের শুরুতেই মামলা-মোকদ্দমায় না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উত্তম। তবে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। গহনা কেনার মেমো বা রসিদগুলো স্ত্রীর নিজ হেফাজতে রাখা আইনি সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আইনগত পরামর্শ: আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও আইনি কৌশলও ভিন্ন হবে। সঠিক প্রতিকারের জন্য একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করা সবসময় শ্রেয়। উপরোক্ত আলোচনাটি শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।