বিচ্ছেদ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়, সন্তানের সাথে নয়! সুতরাং সন্তান যার কাছেই থাকুক না কেন, ভরণপোষণ বাবাকেই দিতে হবে।
কয়েকদিন আগের ঘটনা। আমার চেম্বারে এসে এক ভদ্রমহিলা কাঁদছিলেন। স্বামীর সাথে তার মাস ছয়েক আগে ডিভোর্স হয়েছে। সাত বছরের একমাত্র সন্তানটি মায়ের কোলেই আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ডিভোর্সের পর থেকে ভদ্রলোক সন্তানের পড়ালেখা, খাওয়া-দাওয়া বা চিকিৎসার একটা টাকাও দিচ্ছেন না। মায়ের সামর্থ্য সীমিত, তাই সন্তানকে নিয়ে তিনি পড়েছেন চরম বিপাকে।
ভদ্রলোককে যখন লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলো, ওনার সরল (অথবা অদ্ভুত) যুক্তি, “সন্তান তো মায়ের কাছে থাকে, মা-ই তার দেখাশোনা করছে, তাহলে খরচ আমি কেন দেবো? সন্তান আমার কাছে দিয়ে দিক, আমি খরচ চালাবো।”
আমাদের সমাজে এই ভুল ধারণাটি অধিকাংশ বাবা-মায়ের মনে গেঁথে রয়েছে। অনেক বাবাই মনে করেন, ডিভোর্সের পর সন্তান মায়ের কাছে থাকলে বাবার আর কোনো আর্থিক দায়িত্ব থাকে না। আবার অনেক মা-ও ভাবেন, সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে চাইলে বুঝি বাবার কাছ থেকে খরচের দাবি করা যাবে না।
আজ এই বিষয়টি আপনাদের কাছে একদম পরিষ্কার করে দিতে চাই।
আইন কী বলে? (জিন্মাদারি বনাম ভরণপোষণ)
আইনের চোখে ‘কাস্টডি বা জিম্মাদারি’ (সন্তান কার কাছে থাকবে) এবং ‘ভরণপোষণ বা মেইনটেইন্যান্স’ (সন্তানের খরচ কে দেবে)- দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এই দুইটিকে এক করে ফেলার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
১. জিম্মাদারি মায়ের, খরচ বাবার: মুসলিম পারিবারিক আইন এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ডিভোর্সের পর সন্তান নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মায়ের জিম্মাদারিতে (Custody) থাকবে। কিন্তু সন্তান মায়ের কাছে থাকার অর্থ এই নয় যে, বাবা তার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে গেছেন।
২. বাবার একক বাধ্যবাধকতা: আইন অনুযায়ী, সন্তানের ভরণপোষণ বা খরচ জোগানোর সম্পূর্ণ এবং একক দায়িত্ব কেবলই বাবার। বাবার আর্থিক সামর্থ্য যেমনই হোক না কেন, আইনত তিনি নিজের সন্তানকে খোরপোশ দিতে বাধ্য। মা ধনী হলেও বাবাকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
৩. কতদিন পর্যন্ত খরচ দিতে হবে?
ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে: যতদিন না সে প্রাপ্তবয়স্ক হচ্ছে (সাধারণত ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত) এবং নিজের আয় করার যোগ্যতা অর্জন করছে।
মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে: যতদিন না মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেও যদি মেয়ে অবিবাহিত থাকে, তার সম্পূর্ণ খরচ বাবাকেই বহন করতে হবে। এমনকি ডিভোর্সি বা বিধবা মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্বও বিশেষ পরিস্থিতিতে বাবার ওপর বর্তায়।
আদালতের অবস্থান: ফ্যামিলি কোর্টস অর্ডিন্যান্স (Family Courts Ordinance) অনুযায়ী, বাবা যদি স্বেচ্ছায় সন্তানের খরচ না দেন, তবে মা সন্তানের পক্ষ হয়ে পারিবারিক আদালতে ‘ভরণপোষণের মামলা’ করতে পারেন। আদালত বাবার আয়-উপার্জন বিবেচনা করে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা (যা সন্তানের শিক্ষা ও জীবনযাত্রার জন্য উপযুক্ত) নির্ধারণ করে দেবেন এবং বাবা তা দিতে বাধ্য থাকবেন। অনাদায়ে আইনগত কঠোর ব্যবস্থার বিধান রয়েছে।
বিশেষ পরামর্শ: দাম্পত্য জীবনের তিক্ততার জেরে স্বামী-স্ত্রীর পথ আলাদা হতেই পারে। কিন্তু সেই জেদ বা ক্ষোভের বলি যেন নিষ্পাপ সন্তানটি না হয়। মনে রাখবেন, বিচ্ছেদ আপনার স্ত্রীর সাথে হয়েছে, আপনার সন্তানের সাথে নয়। সন্তানের অধিকার নষ্ট করা কেবল আইনি অপরাধই নয়, নৈতিকভাবেও মস্ত বড় অন্যায়।