দেনমোহরের পার্থক্য: নগদ (মুঅজ্জল) ও বাকি (মু’অজ্জল)

আইন সহায়িকা ব্যানার। “দেনমোহরের পার্থক্য: নগদ (মুঅজ্জল) ও বাকি (মু’অজ্জল)” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

সংসারে থাকা অবস্থায় কি দেনমোহর দাবি করা যায়? নগদ ও বাকি দেনমোহরের আসল সত্যি

“বিয়ের পর ৫ বছর কেটে গেছে, চমৎকার সংসার চলছে। হঠাৎ একদিন স্ত্রী তার দেনমোহরের টাকা চাইলেন, আর স্বামী রেগে গিয়ে বললেন, ‘ডিভোর্স তো হচ্ছে না, তাহলে এখন কিসের দেনমোহর?’—জানেন কি, স্বামীর এই ধারণাটি আইনগতভাবে সম্পূর্ণ ভুল?”

আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষের মনে একটি বিরাট ভুল ধারণা গেঁথে আছে। অনেকে মনে করেন, দেনমোহর কেবল বিবাহ বিচ্ছেদ (ডিভোর্স) হলে কিংবা স্বামী মারা গেলেই পরিশোধ করতে হয়। সংসার চলাকালীন দেনমোহর চাওয়াকে অনেকেই নেতিবাচক বা ঝগড়ার লক্ষণ হিসেবে দেখেন।

কিন্তু একজন আইনজীবী হিসেবে আমি প্রায়ই দেখি, এই অজ্ঞতার কারণে অনেক নারী তাদের বৈধ আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, আবার অনেক পুরুষও অজান্তেই আইনি জটিলতায় পড়েন। আসুন আজ কাবিননামার ১৪ নম্বর কলামের সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সহজ ভাষায় জেনে নিই, যা আপনার জানা অত্যন্ত জরুরি।

কাবিননামার ১৪ নম্বর কলাম এবং দেনমোহরের প্রকারভেদ

নিকাহনামা বা কাবিননামার ১৪ নম্বর কলামে দেনমোহরকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। আরবি উচ্চারণে কাছাকাছি মনে হলেও আইনি ও প্রায়োগিক দিক থেকে এদের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত:

১. মুআজ্জল বা নগদ দেনমোহর (Prompt Dower):

কাবিননামার এই অংশে যে পরিমাণ টাকা বা সম্পত্তি উল্লেখ থাকে, তা হলো ‘নগদ দেনমোহর’।

আইনি সত্য: বিয়ের সময় নগদে বা স্বর্ণ (অন্য কোন অলংকারবাবদ) অথবা স্ত্রী চাইলে বিয়ের পর বা সংসার করা অবস্থায় যেকোনো সময় এই টাকা দাবি করতে পারেন।

স্বামীর বাধ্যবাধকতা: স্ত্রী চাওবামাত্র স্বামী এই নগদ অংশটি পরিশোধ করতে আইনত বাধ্য। স্ত্রী যদি এই টাকা না পান, তবে তিনি স্বামীর সাথে দাম্পত্য মিলন বা একই ছাদের নিচে বসবাস করতে সাময়িকভাবে অস্বীকৃতিও জানাতে পারেন, এবং আইন অনুযায়ী স্বামী তাকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন।

২. মু’অজ্জল বা বাকি দেনমোহর (Deferred Dower):

কাবিননামার এই অংশে যে পরিমাণ টাকা লেখা থাকে, তা হলো ‘বাকি দেনমোহর’।

আইনি সত্য: সাধারণত বিবাহ বিচ্ছেদ হলে অথবা স্বামীর মৃত্যু হলে এই বাকি অংশটি পরিশোধযোগ্য হয়।

ব্যতিক্রম: তবে স্বামী-স্ত্রী যদি নিজেরা চুক্তিবদ্ধ হন যে সংসার চলাকালীন কোনো নির্দিষ্ট সময়ে এই বাকি টাকা পরিশোধ করা হবে, তবে সেই সময়েই তা দিতে হবে।

আইন কী বলে?

মুসলিম পারিবারিক আইন ও জুডিসপ্রুডেন্স অনুযায়ী, দেনমোহর কোনো দয়া বা উপহার নয়; এটি স্ত্রীর প্রতি স্বামীর একটি আইনি ঋণ (Debt)। যদি কাবিননামার ১৪ নম্বর কলামে স্পষ্ট করে উল্লেখ না থাকে যে কতটুকু নগদ আর কতটুকু বাকি, তবে আইনগতভাবে ধরে নেওয়া হয় যে পুরো দেনমোহরটিই ‘নগদ’ বা ‘Prompt Dower’ এবং স্ত্রী যেকোনো সময় তা সম্পূর্ণ দাবি করতে পারেন।

সচেতনতামূলক পরামর্শ:

অনেকেই বিয়ের সময় দেনমোহরের বিশাল অঙ্ক দেখে ভাবেন, “আরে, ডিভোর্স না হলে তো আর দেওয়া লাগছে না!” এই মানসিকতা পরিহার করুন। বিয়ের সময়ই বর ও কনে পক্ষের উচিত পারস্পরিক সামর্থ্য বিবেচনা করে ১৪ নম্বর কলামে নগদ ও বাকির অংশটি সুনির্দিষ্টভাবে এবং পরিষ্কারভাবে লিখে নেওয়া। সম্ভব হলে বিয়ের সময়ই সম্পূর্ণ দেনমোহর পরিশোধ করুন এবং কাবিননামায় তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।

Share the Post:
Scroll to Top