“আমি ডিভোর্স দেবো না, দেখি তুমি কী করতে পারো? কীভাবে এই সম্পর্ক থেকে বের হও!” – স্বামীর এই এক হুমকিতেই কি একজন নিগৃহীত নারীর সারাজীবনের স্বাধীনতা আটকে যেতে পারে?
কয়েকদিন আগে আমার চেম্বারে এসে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মিসেস তানিয়া ইসলাম। গত চার বছর ধরে স্বামীর তীব্র মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করছেন। অবশেষে যখন সিদ্ধান্ত নিলেন আর নয়, তখন স্বামী সাফ জানিয়ে দিলেন, তিনি কোনো কাগজে সই করবেন না, কোনো নোটিশও দেবেন না।
ওদিকে বিয়ের সময়ও কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে তালাক দেয়ার অনুমতি দেয়া হয় নাই। এখন কি তবে তানিয়াকে আজীবন এই নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে?
আমাদের সমাজে তানিয়ার মতো হাজারো নারী প্রতিদিন এই একটা জায়গায় এসে থমকে যান। তারা মনে করেন, স্বামী যদি তালাক দিতে রাজি না হন, তবে বোধহয় সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার আর কোনো আইনি পথ নেই। কাজী অফিসও অনেক সময় স্বামী ছাড়া তালাক রেজিস্ট্রি করতে অপারগতা প্রকাশ করে।
একজন আইনজীবী হিসেবে আপনাদের স্পষ্ট করে জানাতে চাই— আইন কাউকে জোর করে কোনো অত্যাচারী সম্পর্কে বন্দি করে রাখার পক্ষে নয়। স্বামী রাজি না থাকলেও একজন নারী সম্পূর্ণ আইনসম্মত উপায়ে সম্পর্ক থেকে মর্যাদার সাথে বের হতে পারেন।
স্বামী রাজি না হলে আইনি পথটি কী?
যদি নিকাহনামার (কাবিননামা) ১৮ নম্বর ঘরে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা (তালাকে তাওফিজ) দেওয়া না থাকে এবং স্বামী নিজে তালাক দিতে রাজি না হন, তবে স্ত্রীর সামনে সবচেয়ে শক্তিশালী আইনি পথ হলো ‘আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ’।
বাংলাদেশে প্রচলিত ‘১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন’ (The Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939) অনুযায়ী, একজন মুসলিম নারী আদালতের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে মামলা করে বিচ্ছেদ বা ডিক্রি লাভ করতে পারেন।
কোন কোন কারণে স্ত্রী আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন?
এই আইন অনুযায়ী, নিচে উল্লেখিত যেকোনো একটি কারণ প্রমাণ করতে পারলে আদালত বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি জারি করবেন:
১. স্বামী নিখোঁজ থাকলে: যদি টানা ৪ বছর ধরে স্বামীর কোনো খোঁজখবর না পাওয়া যায়।
২. ভরণপোষণ না দিলে: স্বামী যদি টানা ২ বছর স্ত্রীকে খোরপোশ বা ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হন বা অবহেলা করেন।
৩. বহুবিবাহের নিয়ম না মানলে: ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের নিয়ম লঙ্ঘন করে স্বামী যদি সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন।
৪. দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড: স্বামী যদি কোনো অপরাধে ৭ বছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
৫. দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা: কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া স্বামী যদি টানা ৩ বছর দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন।
৬. স্বামীর শারীরিক অক্ষমতা: বিয়ের সময় স্বামী পুরুষত্বহীন থাকলে এবং তা বজায় থাকলে।
৭. ক্রূরতা বা নির্যাতন (Cruelty): স্বামী যদি স্ত্রীকে নিয়মিত শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করেন, তার সম্পত্তি নষ্ট করেন, কিংবা তাঁকে অনৈতিক জীবনযাপনে বাধ্য করার চেষ্টা করেন।
মামলা করলে কি দেনমোহর চলে যাবে?
এটি আরেকটি বড় আইনি বিভ্রান্তি। অনেক নারী ভাবেন, নিজে মামলা করে বিচ্ছেদ চাইলে বুঝি দেনমোহরের টাকা পাওয়া যায় না। বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুল। স্বামীর অন্যায় বা নির্যাতনের কারণে স্ত্রী যদি আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ (Judicial Divorce) চান, তবে স্ত্রী তার সম্পূর্ণ দেনমোহর এবং ইদ্দতকালীন খোরপোশ পাওয়ার অধিকারী থাকবেন।
বিশেষ পরামর্শ: অত্যাচার সহ্য করে মুখ বুজে বসে থাকবেন না। কাজী অফিস যদি ফিরিয়েও দেয়, দেশের প্রচলিত আদালত আপনার অধিকার সুরক্ষায় প্রস্তুত। তবে এই ধরণের মামলায় সঠিক তথ্যপ্রমাণ ও আইনি ধারা উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে মামলাটি দীর্ঘসূত্রিতার কবলে না পড়ে। সঠিক আইনি পরামর্শ নিয়ে পা বাড়ালে যেকোনো জটিল পরিস্থিতি থেকেই সম্মানজনক মুক্তি সম্ভব।
এই লেখাটি কাউকে বিবাহ বিচ্ছেদে উৎসাহিত করার জন্য নয়। এটা দেশের সাধারণ মানুষকে আইন সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের নিমিত্তে লেখা। মনে রাখা দরকার, যে কোন আইনি পদক্ষেপ সাধারণত ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ হয়ে থাকে। আর পারিবারিক ব্যাপারে সাধারণত আইনের আশ্রয় নেয়ার মতো পরিস্থিতি হওয়ার পরই পদক্ষেপ নেয়া উত্তম। তাছাড়াও ডিভোর্স বা বিবাহ বিচ্ছেদ অধিকাংশ সময়েই মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়।