বাবার বাড়িতেই নারী যখন নিগৃহীত, অত্যাচারিত; আইন কি পারবে তাকে রক্ষা করতে?
কয়েকদিন আগে এক মধ্যবয়সী মহিলা এবং তার কন্যা চেম্বারে এলেন। মেয়েটির অপরাধ, সে দেখতে খুব সাধারণ এবং অনেক চেষ্টা করেও একটা চাকরি পাচ্ছে না। এ কারণে আপন ভাই এবং ভাবি প্রতিনিয়ত তাকে অপমান করেন, ঘর থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন, এমনকি মাঝেমধ্যে গায়ে হাতও তোলেন।
মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “স্যার, আমি তো বিবাহিত নই যে স্বামীর বিরুদ্ধে অত্যাচারের মামলা করব। নিজের ভাইয়ের এই অত্যাচার থেকে বাঁচার কি কোনো আইন নেই?”
আমাদের সমাজের একটি মস্ত বড় ভুল ধারণা হলো, আমরা মনে করি নারীদের ওপর নির্যাতন মানেই শুধু ‘স্ত্রীর ওপর স্বামীর নির্যাতন’ বা ‘যৌতুকের জন্য শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার’। কিন্তু যৌথ পরিবারে বা নিজের বাবার বাড়িতে একজন অবিবাহিত মেয়ে, বোন কিংবা একজন বৃদ্ধা মা-ও যে আপনজনদের দ্বারাই চরম নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, তা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।
আজকে আপনাদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি অধিকারের কথা জানাবো।
‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’ আসলে কার জন্য?
এই আইনটি সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ভুল ধারণা আছে যে এটি কেবল বিবাহিত নারীদের জন্য। আসল সত্য হলো, এই আইনটি কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্কের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত পরিবারের অভ্যন্তরে যেকোনো নারী এবং শিশুর সুরক্ষার একটি বিশেষ ঢাল।
আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, একই ছাদের নিচে বা যৌথ পরিবারে বসবাস করেন বা অতীতে বসবাস করেছেন, এমন যেকোনো নারী এই আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন। অর্থাৎ, এই আইনের অধীনে যারা সুরক্ষা পাবেন:
স্ত্রী: স্বামীর যেকোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে।
কন্যা বা অবিবাহিত মেয়ে: নিজের বাবা, ভাই বা অন্য কোনো সদস্যের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে।
মা: সন্তান বা পুত্রবধূর অবহেলা, মানসিক কষ্ট বা ভরণপোষণ না দেওয়ার বিরুদ্ধে।
বোন: ভাই বা পরিবারের অন্য সদস্যদের দ্বারা সম্পত্তিগত বা ব্যক্তিগত নির্যাতনের শিকার হলে।
শিশু: পরিবারের ভেতরে ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো ছেলে বা মেয়ে শিশু (যেমন: গৃহকর্মী হিসেবে থাকা শিশুও যদি নির্যাতনের শিকার হয়)।
কেন এই আইনটি নারীদের জন্য একটি বিশেষ ঢাল?
প্রচলিত অন্যান্য আইনের চেয়ে এই আইনের সুবিধা হলো, এখানে প্রতিকার পেতে আপনাকে সম্পর্ক ভেঙে আলাদা হয়ে যেতে হবে না। নিজের চেনা পরিবেশ বা পরিবারে অবস্থান করেও আপনি আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক কিছু অধিকার আদায় করতে পারবেন। যেমন:
১. যৌথ বাসস্থানে থাকার অধিকার: বাবার বাড়ি বা শ্বশুরবাড়ি, যেকোনো যৌথ বাসস্থান থেকে আপনাকে কেউ অন্যায়ভাবে বের করে দিতে পারবে না।
২. সুরক্ষা আদেশ: আদালত নির্যাতনকারীকে নির্দেশ দিতে পারেন যেন তিনি আপনার সাথে কোনো ধরনের খারাপ আচরণ না করেন।
৩. আর্থিক ক্ষতিপূরণ: অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে চিকিৎসা বা জীবনধারণের জন্য জরুরি খরচের আদেশ দেওয়া হয়।
আইন কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি রাখার জন্য নয়, এটি আপনার অধিকার রক্ষার জন্য। নিজের অধিকার সম্পর্কে জানুন এবং অন্যকেও সচেতন করুন।