তালাক ঠেকানোর কোন আইন আছে কি?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “তালাক ঠেকানোর কোন আইন আছে কি?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, সংসার ভাঙা যেমন কষ্টের, তেমনি একটি ভাঙনউন্মুখ সংসারকে টিকিয়ে রাখা অনেক ক্ষেত্রে আইনি এবং নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে সরাসরি “তালাক নিষিদ্ধ” করার কোনো আইন না থাকলেও, তালাক ঠেকানো বা পুনরায় সংসার শুরু করার বেশ কিছু জোরালো আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।

১. নোটিশ পরবর্তী ৯০ দিনের সময়সীমা

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী, স্বামী বা স্ত্রী যে পক্ষই তালাক দিক না কেন, তাকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট স্থানীয় চেয়ারম্যান/মেয়রকে নোটিশ দিতে হয় এবং অপর পক্ষকে তার কপি পাঠাতে হয়।

নোটিশ দেওয়ার পর ৯০ দিন (বা স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত) তালাক কার্যকর হয় না।

এই ৯০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে মূলত উভয় পক্ষকে নিজেদের ভুল সংশোধন করে পুনরায় মিলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য।

২. সালিসি পরিষদ (Arbitration Council)

তালাকের নোটিশ পাওয়ার পর চেয়ারম্যান/মেয়র একটি সালিসি পরিষদ গঠন করেন। আইনের বিধান হলো, এই পরিষদ উভয় পক্ষকে ডেকে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করবে। আপনি যদি তালাক ঠেকাতে চান, তবে এই সালিসি বৈঠকে উপস্থিত হয়ে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সংসার টিকিয়ে রাখার প্রস্তাব দিতে পারেন। সালিসি পরিষদের মাধ্যমে মীমাংসা হয়ে গেলে তালাকের নোটিশটি অকার্যকর হয়ে যায়।

৩. দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলা (Restitution of Conjugal Rights)

যদি স্ত্রী বা স্বামী কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই আলাদা থাকেন এবং বিচ্ছেদের কথা ভাবেন, তবে অপর পক্ষ পারিবারিক আদালতে ‘দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার’-এর মামলা করতে পারেন। এই মামলার উদ্দেশ্য হলো আদালতের মাধ্যমে অপর পক্ষকে সংসারে ফিরে আসার জন্য আইনিভাবে আহ্বান জানানো। যদিও আদালত কাউকে জোর করে সংসার করাতে পারে না, তবে এটি তালাক ঠেকাতে একটি শক্তিশালী আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করে।

৪. ভুল বোঝাবুঝি ও নোটিশ প্রত্যাহার

তালাকের নোটিশ পাঠানোর ৯০ দিনের মধ্যে যেকোনো সময় যে পক্ষ নোটিশ পাঠিয়েছে, সে চাইলে তা প্রত্যাহার (Withdraw) করতে পারে। অর্থাৎ, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই যদি সমঝোতা হয়ে যায়, তবে কোনো নতুন বিয়ে ছাড়াই তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকতে পারবেন।

৫. সমঝোতা বা মধ্যস্থতা (Mediation)

বর্তমানে বাংলাদেশের আদালতগুলো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির চেয়ে আপস-মীমাংসাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। মামলার যেকোনো পর্যায়ে বিজ্ঞ বিচারক উভয় পক্ষকে ‘মিডিয়েশন’ বা মধ্যস্থতার সুযোগ দেন। এখানে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে আপনারা নিজেদের সমস্যাগুলো আলোচনা করে তালাক না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমেও এমন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে।

আইনি পর্যবেক্ষণ:

তালাক কোনো সমাধান নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার শুরু। বিশেষ করে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আইন ৯০ দিনের একটি লম্বা সময় দেয় পুনর্বিবেচনার জন্য। এই সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং সঠিক আইনি পরামর্শ একটি সুন্দর সংসারকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

পরিষেশে, বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম আইন অনুযায়ী, কোনো পক্ষ যদি আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তালাক দিতে চায়, তবে তা ঠেকানোর কোনো আইন নেই।

Share the Post:
Scroll to Top