ভদ্রমহিলার স্বামী অন্য এক নারীর সঙ্গে নিয়মিত ফোনে কথা বলেন, বার্তা আদান-প্রদান করেন। আরও মারাত্মক বিষয় হলো, স্বামী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাকে এটা মেনেই সংসার করতে হবে। তিনি সেই নারীকে বিয়েও করবেন না, আবার তাকেও (স্ত্রীকে) তালাক দেবেন না। গতকাল মেসেঞ্জারে এক অসহায় বোনের প্রশ্ন ছিল এটি। ব্যাপারটা আমাকে খুব নাড়া দিয়েছে।
তিনি আরও প্রশ্ন করেছিলেন, এই মানসিক নির্যাতন আর ভার্চুয়াল পরকীয়ার বিরুদ্ধে কি তিনি কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন? তার স্বামীর এই আচরণ কি শুধু ‘অনৈতিক’, নাকি আইনের চোখে এটি গুরুতর অপরাধ? স্বামী তাকে না তালাক দিয়ে, না ছেড়ে, কেবল মানসিকভাবে জিম্মি করে রেখেছেন। এই পরিস্থিতিতে একজন স্ত্রীর করণীয় কী হতে পারেন?
তার মতো এমন বহু স্ত্রী নীরবে স্বামীর এই ধরনের আচরণের শিকার হচ্ছেন। তাদের দাম্পত্য জীবন ভালোবাসাহীন হলেও, সামাজিক চাপ বা ভবিষ্যতের চিন্তায় তারা সম্পর্ক থেকে বের হতে পারছেন না।
ভার্চুয়াল সম্পর্ক কি দাম্পত্য জীবনে ‘নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে গণ্য হতে পারে? স্ত্রী হিসেবে নিজের অধিকার রক্ষার জন্য আইন কি কোনো পথ বাতলে দেয়? চলুন, এই জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আইন কী বলে, তা স্পষ্ট করে জেনে নেওয়া যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা: ভার্চুয়াল পরকীয়া বনাম স্ত্রীর অধিকার
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরকীয়া (Adultery) কেবল শারীরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়। সত্যি বলতে, পরকীয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমাদের দেশে সরাসরি কোনো আইন নেই। তবে স্বামীর ভার্চুয়াল সম্পর্ক বা মেসেজ আদান-প্রদান স্ত্রীর জন্য আইনি প্রতিকারের পথ বন্ধ করে দেয় না।
দাম্পত্য জীবনে ‘নিষ্ঠুরতা’ (Cruelty) হিসেবে গণ্য: স্বামী যদি অন্য নারীর সঙ্গে মেসেজ আদান-প্রদান করেন বা ভার্চুয়াল সম্পর্ক রাখেন এবং স্ত্রীকে তা মেনে নিতে চাপ দেন, তবে এই আচরণ মানসিক নিষ্ঠুরতা (Mental Cruelty) হিসেবে গণ্য হতে পারে। এমনকি, যদি এই নিষ্ঠুরতার জন্য স্ত্রী পৃথক বসবাস করেন, তবে অবশ্যই তিনি স্বামীর কাছে থেকে নিয়মিত ভরণপোষণ আদায় করতে পারবেন।
তালাকের অধিকার: আইন অনুযায়ী, যদি স্বামী তার স্ত্রীকে মানসিকভাবে নির্যাতন করেন বা নিষ্ঠুর আচরণ করেন, তবে স্ত্রী এই ‘মানসিক নিষ্ঠুরতা’র ভিত্তিতে আদালতে তালাকের আবেদন জানাতে পারেন। কেননা, এই ধরণের আচারণ পারিবারিক সহিংসতা হিসেবে গণ্য হয়, যা পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ অনুযায়ী এটি সুস্পষ্ট অপরাধ।
ভরণপোষণ ও মোহরানার দাবি: এই কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে আদালত স্ত্রীকে তার পূর্ণ মোহরানা এবং ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ আদায়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।
ফৌজদারি আইনের সীমাবদ্ধতা: বর্তমানে বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী পরকীয়া কেবল তখনই অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, যখন তা শারীরিক সম্পর্কে গড়ায়। তবে, স্বামীর এই আচরণ যেহেতু দাম্পত্য জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে, তাই স্ত্রীর জন্য বিবাহ বিচ্ছেদ বা আইনি সুরক্ষার অন্যান্য পথ খোলা থাকে। আর, এই ধরণের পারিবারিক সমস্যাগুলো সমাধান পরিবারে থেকেই করা শ্রেয়। শুধু সেই উপায়গুলো জানতে হবে। সে সম্পর্কে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
আপনার করণীয়-
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও আইনি পদক্ষেপও ভিন্ন হবে। স্বামীর বিরুদ্ধে ‘মানসিক নিষ্ঠুরতা’ প্রমাণ করতে মেসেজের প্রমাণ এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য খুবই জরুরি। সঠিক আইনি পরামর্শ ও পদক্ষেপের জন্য অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।