স্বামী অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। শাস্তি মাত্র ১ বছরের জেল বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। গত কয়েকদিনে আমার লেখা প্রতিবেদনগুলোতে প্রচুর কমেন্ট পেয়েছি, এই শাস্তির ব্যাপারে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন শাস্তি এতো কম কেন? অন্যদিকে, অনেকেই আবার জানেন, দ্বিতীয় বিয়ের জন্য দণ্ডবিধিতে ৭ বছর পর্যন্ত জেলের বিধান আছে।
এই দুই ধরনের শাস্তির বিধান শুনে অনেকে বিভ্রান্ত হন। স্বামীকে যদি সামান্য ১ বছর জেলের ঝুঁকি নিতে হয়, তবে অনেকে সেই ভুল বারবার করার সাহস পায়। কিন্তু কেন এই দুই আইনের শাস্তিতে এত বড় পার্থক্য? স্বামী কি কেবল ১ বছরের সাজার ঝুঁকি নিচ্ছেন, নাকি তিনি আরও বড় শাস্তির মুখে পড়তে পারেন?
এই আইনি জটিলতা বহু নির্যাতিত নারীকে সঠিক আইনি পথ নিতে দ্বিধায় ফেলে দেয়। মুসলিম পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে কোন আইন প্রযোজ্য হবে এবং কখন তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে- এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি স্পষ্ট করে জেনে নেওয়া যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা: দুই আইনের পার্থক্য ও প্রয়োগ
বাংলাদেশে দ্বী-বিবাহ বা বহুবিবাহের জন্য মূলত দুটি আইন রয়েছে: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৯৪ ও ৪৯৫ ধারা।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (ধারা ৬):
প্রয়োগক্ষেত্র: এটি প্রধানত মুসলিম পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য, যখন তারা সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই আইনে অনুমতি ব্যতিত বিবাহকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
শাস্তি: এই আইনে, শাস্তি হলো এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ৪৯৪ এবং ৪৯৫):
প্রয়োগক্ষেত্র: এই আইনটি সাধারণত অমুসলিমদের (যেমন: হিন্দু, খ্রিস্টান) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের নিজ নিজ ব্যক্তিগত আইনে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ। ( প্রথাগত হিন্দু আইনে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ নয়, তাই তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি প্রতিকার পাওয়া সহজ নয়) ( বৌদ্ধদের ব্যাপারেও একই বিধান প্রযোজ্য।
মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ: মুসলিম পুরুষদের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি ৪৯৪ অথবা ৪৯৫ ধারা তখনই প্রযোজ্য হতে পারে, যখন-
চারটির বেশি বিবাহ: কোনো মুসলিম পুরুষ যখন চারটির (চার স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায়) বেশি বিবাহ করেন। অর্থাৎ মুসলিম পুরুষদের ক্ষেত্রে অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে (চারটি পর্যন্ত) বৈধ।
মুসলিম নারীর বিবাহ: কোনো মুসলিম নারী যখন প্রথম স্বামী বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিবাহ করেন (কারণ মুসলিম নারীর জন্য বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)।
শাস্তি: ধারা ৪৯৪ অনুযায়ী শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা।
ধারা ৪৯৫ অনুযায়ী, যদি পূর্বের বিয়ের বিষয়টি গোপন রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করা হয়, তবে শাস্তি দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
অর্থাৎ- মুসলিম পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ের (৪টির মধ্যে) ক্ষেত্রে সাধারণত প্রথমত মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১ প্রয়োগ করা হয়। তবে, মুসলিম নারী বা অমুসলিমরা বহুবিবাহ করলে অথবা মুসলিম পুরুষেরা ৪টির বেশি বিয়ে করলে দণ্ডবিধির কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা হয়। দণ্ডবিধির ৪৯৪ অথবা ৪৯৫ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়।
উল্লেখ্য, এখানে বাংলাদেশে প্রচলিত আইনের আলোকে আলোচনা করা হল। যা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য।
আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও, কোন ক্ষেত্রে কোন আইন প্রয়োগ করা হবে, তা পরিস্থিতির নির্ভরশীল। স্বামীর অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী সঠিক ধারায় মামলা করতে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।