প্রিয় পাঠক, আজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুল আলোচিত আইনি বিষয়ে আলোকপাত করছি। আমাদের সমাজে অনেকেরই ধারণা, স্ত্রী যদি নিজে থেকে তালাক বা বিচ্ছেদ চান, তবে তিনি দেনমোহরের অধিকার হারিয়ে ফেলেন। আইনের ভাষায় এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
১. দেনমোহর স্ত্রীর অর্জিত অধিকার:
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই স্ত্রী দেনমোহরের মালিকানা লাভ করেন। এটি একটি বিয়ের অবিচ্ছেদ্য শর্ত। তালাক কে দিচ্ছে- স্বামী নাকি স্ত্রী, তার ওপর ভিত্তি করে দেনমোহরের অধিকার নষ্ট হয় না। স্ত্রী নিজে তালাক দিলেও তিনি তার পাওনা পূর্ণ দেনমোহর আদায়ের অধিকারী।
২. তালাক-ই-তৌফিজ (স্বামীর দেয়া তালাকের ক্ষমতা):
সাধারণত কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে যদি স্বামীকে তালাক দেয়ার ক্ষমতা (তালাক-ই-তৌফিজ) দেয়া থাকে, তবে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে স্ত্রী তালাক দিলেও তার দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে।
৩. ‘খুলা বা খোলা’ তালাকের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম
আইনে কেবল একটি ক্ষেত্রেই দেনমোহর মাফ বা কমানোর সুযোগ থাকে, যাকে বলা হয় ‘খুলা’ (Khula) তালাক।
যদি স্ত্রী স্বামীর কোনো দোষ ছাড়াই কেবল নিজের ইচ্ছায় বিচ্ছেদ চান এবং স্বামী তাতে সহজে রাজি না হন, তবে স্ত্রী কিছু সম্পত্তি বা দেনমোহরের অংশ ত্যাগ করার বিনিময়ে স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ চাইতে (কিনে নিতে) পারেন।
তবে এটি উভয় পক্ষের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। স্ত্রী নিজে থেকেই দেনমোহর ছাড়তে রাজি না হলে আদালত সাধারণত দেনমোহর মওকুফ করে না।
৪. আদালত ও দেনমোহর আদায়
স্ত্রী যদি পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেন, তবে আদালত ডিক্রি জারির পাশাপাশি দেনমোহর ও ভরণপোষণ পরিশোধের আদেশ দিয়ে থাকে। স্ত্রী নিজে তালাক দিয়েছেন, এই অজুহাতে কোনো স্বামী দেনমোহর দিতে অস্বীকার করতে পারেন না।
৫. মোহরানা বাকি থাকলেও কি তালাক দেয়া যায়?
অবশ্যই। দেনমোহর বাকি থাকা বা পরিশোধ হওয়া তালাক কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়। তবে বিচ্ছেদের পর দেনমোহর একটি আইনি ঋণ হিসেবে স্বামীর কাছে থেকে যায়, যা স্ত্রীকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে।
পরিশেষে, বিবাহের সময় ও বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আপনার কাবিননামার শর্তগুলো ভালো করে দেখে নিন। তালাক যে পক্ষই দিক না কেন, দেনমোহর স্ত্রীর সম্মান এবং আইনি প্রাপ্য। এই অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা আইনের পরিপন্থী।