আইনত পরকীয়া আক্রান্ত নারীর কোন শাস্তি হয় না কেন?

অনেকেই বলেন, “‘সে তো বিধবা’ অথবা ‘সে তো তালাকপ্রাপ্ত’ – তাহলে অপরাধ কোথায়?” আইন অনুসারে তে তো শাস্তি পেতে পারে না! কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক করে বিয়ে করলে, সেই অবিবাহিত বা বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্ত নারী কি একেবারেই দায়মুক্ত?

উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারা অর্থাৎ ব্যভিচার বা পরকীয়ার অভিযোগ প্রযোজ্য হয় না। যদিও পুরুষটি বিবাহিত এবং তার স্ত্রী বর্তমান রয়েছে। কেন এমনটা হয়, সেটা জেনে নেয়া যাক –

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৯৭ ধারা (ব্যভিচার) অনুযায়ী, অপরাধী হিসেবে ধরা হয় বিবাহিত পুরুষকে সেই সম্পর্কে জড়িত নারীকে নয়। ফলে, যার স্বামীর সঙ্গে পরকীয়া হয়েছে, তিনি ৪৯৭ ধারায় সেই নারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন না, তার কোন শাস্তি হতে পারে না, এটিই আইন। যদিও আজকের দিনে, এটিকে আইনগত সীমাবদ্ধতা এবং বৈষম্যমূলক বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।

তাহলে তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারীর কি কোনো শাস্তিই নেই?

(ক) যদি তিনি সত্যিই তালাকপ্রাপ্ত বা অবিবাহিত অথবা বিধবা হন এবং কোনো বিদ্যমান বিয়ে না থাকে, তালাক বা ইদ্দত সংক্রান্ত জটিলতা না থাকে, তাহলে পরকীয়া করা তার জন্য কোনো অপরাধ নয় (আইনের সংজ্ঞা অনুসারে)। আইন এখানে বলে, অনৈতিক হতে পারে, কিন্তু অপরাধ নয়! ব্যাপারটা আরও একটু পরিস্কার করা যাক।

পরকীয়া হতে হলে, সেই নারীকে অবশ্যই বিবাহিত হতে হবে; মানে তার স্বামী বর্তমান থাকতে হবে এবং সংজ্ঞা অনুসারে স্বামীর অধিকার খর্ব হতে হবে। অবিবাহিত, তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারী বিবাহিত পুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়ালে, সেটাকে পরকীয়া বলা যাবে না। অতন্ত পরকীয়ার সংজ্ঞা অনুসারে। যদিও আমাদের সমাজে এই সম্পর্কগুলোকে পরকীয়া হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। আইনি সংজ্ঞায় এগুলো, বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক।

তাহলে পরকীয়ার পুঁথিগত সংজ্ঞাটা একবার পড়ে নেয়া যাক:

[Whoever has sexual intercourse with a person who is and whom he knows or has reason to believe to be the wife of anather man, without the consent or connivance of that man, such sexual intercourse not amounting to the offence of rape, is guilty of the offence of adultery, and shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to five years, or with fine, or with both. In such case the wife shall not be punished as an abettor.]

যে ব্যক্তি এমন একজন নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, যিনি অন্য একজন পুরুষের স্ত্রী এবং সে জানে বা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে তিনি অন্যের স্ত্রী, কিন্তু সেই পুরুষের সম্মতি বা সহযোগিতা ছাড়া, এবং সেই যৌন সম্পর্ক যদি ধর্ষণের অপরাধে পরিণত না হয়, তবে তা ব্যভিচারের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর জন্য তাকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, বা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীকে সহযোগী হিসেবে শাস্তি দেওয়া হবে না।

(খ) তবে ব্যতিক্রম কখন তৈরি হয়?

১. বিগ্যামি বা অবৈধ বিয়ে (দণ্ডবিধি ৪৯৪): যদি প্রমাণ হয়, নারী নিজে আইনত বিবাহিত ছিলেন যথাযথ তালাক বা ইদ্দত ছাড়া নতুন বিয়ে করেছেন, তখন তার স্বামী (প্রথম স্বামী) ৪৯৪ ধারায় মামলা করতে পারবেন। যার শাস্তি: ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে এই মামলা শুধুমাত্র প্রথম স্বামী করতে পারেন, অন্য কেউ (প্রথম স্ত্রীর পরিবার, সমাজ) নয়।

২. প্রতারণা (দণ্ডবিধি ৪১৫/৪১৭): যদি নারী, নিজের বৈবাহিক অবস্থা গোপন করেন মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিয়ে করেন তাহলে প্রতারণার মামলা হতে পারে।

৩. সাইবার আইন: যদি, ব্ল্যাকমেইল, অশ্লীল ছবি বা ভিডিও অথবা হুমকি বা অনলাইন হয়রানিমূলক কিছু হয়ে থাকে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সংশ্লিষ্ট সাইবার আইনে মামলা হতে পারে, নারী বা পুরুষ, উভয়ের বিরুদ্ধেই।

৪. নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন: যদি সেই সম্পর্কের কারণে, প্রথম স্ত্রী মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, হুমকি বা সহিংসতা হয়, তবে স্বামীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনপ্রযোজ্য হতে পারে। যদিও নারীর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রয়োগ তবে না, তবে সহযোগী ভূমিকা প্রমাণ হলে তদন্তে আসতে পারে।

তাহলে পুরুষের পরিবার বা স্ত্রী কী করতে পারেন?

স্বামীর বিরুদ্ধে, Muslim Family Laws Ordinance, 1961 (ধারা ৬) অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে হলে পারিবারিক আইনে মামলা, দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলা বা নিষ্ঠুর আচরণ দেখিয়ে তালাক বা বিচ্ছেদ মামলা অথবা সালিসি পরিষেদে যেতে পারেন।

এই অবস্থাগুলোকে সামাজিকভাবে প্রতিরোধের বাস্তব উপায় কী?

  • বিয়ের আগে কাজী অফিসের নিকাহ রেজিস্টার যাচাই-বাছাই করা
  • সামাজিক সালিস ও লিখিত আপত্তি প্রদান
  • আইনি নোটিশ (Cease & Desist) প্রদান
  • আইনসম্মতভাবে প্রমাণ সংরক্ষণ ও প্রয়োগ।

তবে এই সকল ক্ষেত্রে আবেগ নয়, নথি ও প্রমাণের উপর ভরসা করে এগোতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ: আইন সবার জন্য এক হলেও, প্রতিটি ঘটনার বাস্তবতা আলাদা। তাই প্রয়োজনে অবশ্যই একজন দক্ষ পারিবারিক আইনজীবীর সঙ্গে নিজ নিজ পরিস্থিতি অনুযায়ী পরামর্শ নিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top