’মৌখিক তালাক’ বনাম ’আইনি তালাক’, কোনটি বৈধ?

“রাগের মাথায় তিনবার ‘তালাক’ বললেই কি বিয়ে ভেঙে যায়? এই একটি ভুল ধারণার কারণে হাজার হাজার পরিবার আজ ধ্বংসের মুখে।”

গত সপ্তাহে কথা। আমার সাথে ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ বাবার কথা হচ্ছিল তাঁর মেয়েকে নিয়ে। মেয়েটির বিয়ে হয়েছে মাত্র এক বছর। পারিবারিক তুচ্ছ এক ঝগড়ার এক পর্যায়ে স্বামী রাগের মাথায় তিনবার ‘তালাক’ উচ্চারণ করেন। পরদিন স্বামী নিজের ভুল বুঝতে পেরে সংসার চালিয়ে যেতে চাইলেও গ্রামের মানুষ ও ফতোয়াবাজরা ফতোয়া দিল, ‘তালাক হয়ে গেছে, এখন হিল্লা বিয়ে ছাড়া উপায় নেই।’ মেয়েটির জীবন যেন এক নিমিষেই অন্ধকার হয়ে গেল।

এটি কেবল একটি গল্প নয়, আমাদের দেশের হাজারো মানুষের বাস্তব জীবন। চলুন জেনে নেয়া যাক, মৌখিক তালাক এবং আইনি তালাকের আসল সত্যটি কী।

১. শরিয়াহ আইনের দৃষ্টিকোণ

ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, রাগের মাথায় বা একসাথে তিন তালাক দেওয়া অত্যন্ত গুনাহের কাজ এবং এটি চরমভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আধুনিক অনেক ইসলামি স্কলার এবং মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশের আইন অনুযায়ী, একসাথে তিন তালাক দিলেও তা ‘এক তালাক’ হিসেবে গণ্য হয় এবং স্বামী-স্ত্রী চাইলে ইদ্দতকালীন সময়ের মধ্যে আবারও সংসার শুরু করতে পারেন। (আমি আলেম নই, তবে যথেষ্ট পড়াশোনা ও জানার চেষ্টা থেকে এই অংশটুকু লিখলাম; এবং এটি সরাসরি আমার বলবার বিষয় নয়। আলোচনার প্রয়োজনে বিষয়টির অবতারণা হলো মাত্র।)

২. বাংলাদেশের আইনের প্রেক্ষাপট (মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১)

বাংলাদেশে শুধু মুখে ‘তালাক’ বললে আইনত বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর হয় না। ১৯৬১ সালের আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী তালাক কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে:

নোটিশ প্রদান: তালাক দেওয়ার পর স্বামীকে অবশ্যই চেয়ারম্যান/মেয়রকে লিখিতভাবে নোটিশ দিতে হবে এবং স্ত্রীকে তার কপি পাঠাতে হবে।

৯০ দিনের ইদ্দত কাল: নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন (গর্ভাবস্থায় বেশি হবে) পর তালাক কার্যকর হবে। এই ৯০ দিনের মধ্যে কোনো নোটিশ ছাড়া মুখে তালাক বললে তার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।

সালিসি পরিষদ: নোটিশ পাওয়ার পর চেয়ারম্যান স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপস করানোর জন্য একটি সালিসি পরিষদ গঠন করবেন। যদি এই ৯০ দিনের মধ্যে তাদের মধ্যে মিটমাট হয়ে যায়, তবে তালাকটি বাতিল হয়ে যাবে।

মোট কথা, বাংলাদেশের আইনে, মুখে তালাক বললে তালাক হয় না। যতক্ষণ না যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া (নোটিশ ও ৯০ দিন অপেক্ষা) অনুসরণ না হয়। কেবল মুখে তালাক দিলে আইনিভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ হবে না। আর শরিয়াহ ব্যাপার তো ইতিমধ্যে উপরে আলোচনা করাই হয়েছে।

তবে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের মুসলিম আইন, ফারায়েজসহ অন্য কিছু আইন শরিয়াহ আইনে থেকে অনুসৃত। কিন্তু সরাসরি শরিয়াহ আইনের প্রয়োগ নেই। তাই বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় আইন-ই প্রযোজ্য এবং তা-ই সকলকে মানতে হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে, রাষ্ট্রীয় আইনে মুখে মুখে উচ্চারিত তালাকে কিছু হয় না (বিষয়টি আবারও লিখে পরিস্কার করার চেষ্টা করলাম)।

আপনার জন্য পরামর্শ: আইনকানুনগুলো একই হলেও প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হয়। তাই কেবল কারো কথা শুনে বা আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। যেকোনো বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করা জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top