কাবিননামার কোথাও লেখা নেই গহনাগুলো ‘দেনমোহরের অংশ’!

বিয়ের সময় উপহার হিসেবে দেওয়া স্বর্ণালঙ্কার বা ফার্নিচার কি স্ত্রীর দেনমোহর? এ দেশের সিংহভাগ মানুষ এই একটি জায়গায় ভুল করে আইনি জটিলতায় পড়েন।

সম্প্রতি সময়ের একটি ঘটনা এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। একজন নারী এসেছিলেন দেনমোহরের সমস্যা নিয়ে। বিয়ের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় তাদের ডিভোর্স হয়। কাবিননামায় দেনমোহর ছিল ৫ লক্ষ টাকা।

কিন্তু তার স্বামী আদালতে দাবি করেন, বিয়ের সময় তিনি স্ত্রীকে ৩ লক্ষ টাকার গহনা দিয়েছেন, তাই দেনমোহর মাত্র ২ লক্ষ টাকা বাকি। কিন্তু আসল ব্যাপার হলো, কাবিননামায় কোথাও লেখা নেই যে, ওই গহনাগুলো ‘দেনমোহরের অংশ’ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

ফলে আইনি লড়াইয়ে স্বামী বিপাকে পড়েছেন, আর স্ত্রী পড়েছেন মানসিক যন্ত্রণায়। আমাদের দেশে এমন হাজারো পরিবার কেবল “উপহার” আর “দেনমোহর”-এর পার্থক্য না বোঝার কারণে আদালতের বারান্দায় ঘুরছে।

দেনমোহর কি উপহার, নাকি নারীর আইনি অধিকার? এ প্রসঙ্গে আসুন বিস্তারিত জেনে নেয়া যা-

বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, দেনমোহর কোনো দান বা দয়া নয়; এটি স্ত্রীর কাছে স্বামীর একটি আইনি ঋণ (Debt)।

উপহার বনাম দেনমোহর: বিয়ের সময় স্বামী বা তার পরিবার থেকে পাওয়া গয়না বা উপহার সাধারণ সৌজন্য হতে পারে। যদি কাবিননামার ১৩, ১৪, ১৫, ১৬ অথবা ২০ নং কলামে সুনির্দিষ্টভাবে ওই গয়নাকে ‘দেনমোহর বাবদ পরিশোধ’ বা ‘উসুল’ হিসেবে না দেখানো হয়, তবে সেটিকে দেনমোহর হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

আদায়ের সময়: স্ত্রী চাইলে দাম্পত্য জীবন বজায় থাকা অবস্থাতেই তার ‘আশু দেনমোহর’ (Prompt Dower) দাবি করতে পারেন। স্বামী দিতে অস্বীকার করলে দাম্পত্য মিলন বন্ধ করার অধিকারও স্ত্রীর আছে।

উত্তরাধিকারদের দায়: একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা জানতে হবে। স্বামী মারা গেলেও যদি দেনমোহর অনাদায়ী থাকে, তা কিন্ত মাফ হবে না। স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে সন্তাদের উত্তরাধিকার বণ্টনের আগে এই দেনমোহর পরিশোধ করতে হয়। কেননা, দেনমোহর স্বামীর জন্য একটি ঋণ স্বরূপ।

এ প্রসঙ্গে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে এটিও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দেনমোহর স্ত্রীর প্রতি একটি বাধ্যতামূলক বাধ্যবাধকতা। এমনকি স্বামী যদি তালাক প্রদান নাও করেন, তবুও স্ত্রী মামলা করে তার পাওনা দেনমোহর আদায়ের অধিকার রাখেন।

তাই সবার মনে রাখা দরকার, দেনমোহর নারীর ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সম্মানের প্রতীক। অবশ্যই বিয়ের সময় কাবিননামা পড়ার সময় সচেতন হোন, প্রয়োজনে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, সচেতনতা আপনার অধিকার রক্ষায় প্রথম ধাপ।

প্রয়োজন হলে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন। কেননা, আইনকানুনগুলো একই হলেও প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও সমাধানও ভিন্ন হতে পারে। উপরোক্ত আলোচনায় সাধারণভাবে প্রতিকারগুলো কী হতে পারে, সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top