মা হলেই কি সন্তানের জিম্মাদারি পাওয়া নিশ্চিত? আইনে এমনটা উল্লেখ আছে বলেই কি একজন মা, যেনতেন ভাবে, অনুপযুক্ত পরিবেশে তার সন্তানকে লালন-পালন করেতে পারবেন? বাবার কিছুই করার থাকবে না! – এ সম্পর্কে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা রয়ে গেছে। চলুন সে সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।
আমাদের সমাজে একটি গভীর বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, বিচ্ছেদ হলে মা মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্তানের জিম্মাদারি বা কাস্টডি পাবেন। কিন্তু আইন কি আসলেই এতটা সরল? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা।
সম্প্রতি এক মামলার শুনানির আলোকে ঘটনাটা সামনে এলো। এক মা দাবি করলেন, তার সন্তান অনেক ছোট, তাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝেন না, তা তাকে অবশ্যই তার জিম্মায় দিতে হবে। কিন্তু আদালত তদন্তে দেখতে পেলেন, বাচ্চাটির মা এমন এক পরিবেশে বসবাস করছে, যা বাচ্চাটির নৈতিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং তিনি সন্তানের নূন্যতম প্রয়োজনীয়তা পূরণেও উদাসীন।
অন্যদিকে, বাবা আর্থিকভাবে সচ্ছল। তার চেয়েও বড় কথা – তিনি সন্তানের লেখাপড়া এবং সঠিক বিকাশের জন্য একটি সুন্দর পরিকল্পনা ও পরিবেশ নিশ্চিত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আদালত এখানে ‘মা’ বা ‘বাবা’র অধিকার নয়, বরং ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’ (Best Interests of the Child) বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
আইনগত ব্যাখ্যা ও মাপকাঠি: বাংলাদেশে সন্তানদের অভিভাবকত্ব ও জিম্মা নির্ধারিত হয় মূলত Guardians and Wards Act, 1890 অনুযায়ী। আদালত কেবল মা হিসেবে কাউকে জিম্মা দেন না, বরং নিচের বিষয়গুলো কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন:
ক. সন্তানের বয়স ও লিঙ্গ: সাধারণ নিয়মে আইন বলছে, একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত পুত্র ও কন্যা সন্তানের জিম্মাদারি মা পেলেও সেটাই শেষ কথা নয়।
খ. চরিত্র ও সক্ষমতা: মা বা বাবা- কার নৈতিক চরিত্র এবং জীবনধারা সন্তানের জন্য নিরাপদ? সেটাও অত্যন্ত গুরুত্ব পাবে।
গ. আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও পরিবেশ: সন্তান যেখানে বড় হবে, সেই পরিবেশটি তার ভবিষ্যতের জন্য কতটা উপযোগী; সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নিশ্চিত করা অন্যতম ভূমিকা রাখবে।
ঘ. সন্তানের ইচ্ছা: সন্তান যদি কিছুটা বুঝতে শেখে, তবে আদালত কখনো কখনো তার মতামতকেও গুরুত্ব দেন; ইদ্যাতি।
আর বিশেষভাবে শুধু মায়ের জিন্মাদারি হারানোর ক্ষেত্রগুলো হলো, মা যদি পুনরায় বিয়ে করেন (কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ছাড়া), যদি মায়ের চরিত্র বা জীবনযাপন সন্তানের জন্য অনিরাপদ মনে হয়, সন্তানের দেখাশোনায় যদি মা চরম অবহেলা করেন, মা যদি সন্তানকে বাবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চান বা অনৈতিক কোনো কাজ করেন; ইত্যাদি।
এছাড়াও বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন নজির ও বেশ কিছু রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, “মা বা বাবার ব্যক্তিগত অধিকারের চেয়ে শিশুর কল্যাণই হচ্ছে সর্বোত্তম বিচার্য বিষয়।” মোট কথা, আইনগত নিয়মের চেয়েও বড় হলো শিশুর সুরক্ষা। তাই বিচ্ছেদ পরবর্তী এ কথা নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া যায় না, আইনে আছে তাই মা মানেই সন্তানের জিন্মাদার। সন্তানের জিম্মাদারির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শর্ত হলো ‘সন্তানের সর্বোচ্চ কল্যাণ’ (Welfare of the Child)। আদালত যদি দেখে যে মায়ের কাছে থাকলে সন্তানের শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হতে পারে, তবে মা আইনত অধিকার থাকা সত্ত্বেও জিম্মাদারি হারাতে পারেন।
আপনার জন্য পরামর্শ: প্রতিটি মামলার প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। আইনকানুনগুলো একই হলেও উপস্থাপনের ধরনে ফলের ভিন্নতা আসে। তাই যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।