স্বামী কি অবাধ্য স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে বাধ্য?

স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য হলে বা বিনা কারণে আলাদা থাকলে, ভরণপোষণের অধিকার কি বাতিল হয়ে যায়? আমাদের দেশের হাজারো দম্পতির জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর আইনি জটিলতা। কিছুদিন আগের একটি ঘটনা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

আরিফ আর সায়মার ছোট্ট সংসার। গত প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে ভালোই চলছিল। কিন্তু ছয় মাস হলো তাদের সংসারে হঠাৎই যেন চরম অশাস্তি ভর করলো। সায়মা কোনো কারণ ছাড়াই দিনের পর দিন বাপের বাড়ি গিয়ে পড়ে থাকছে, আরিফ বারবার অনুরোধ করলেও সে স্বামীর সংসারে ফিরতে নারাজ। উপরন্ত সায়মা আরিফের কাছ থাকে ভরণপোষণ নেয়া শুরু করে দেয়। প্রথম দিকে হাত-খরচের কথা বলে সেই খরচ আদায় করা হতো।

কিন্তু একপর্যায়ে আরিফ সেই হাতখরচ বা ভরণপোষণ বন্ধ করে দিলে বিষয়টি আইনি সালিশ পর্যন্ত গড়ায়। সায়মার ধারণা ছিল, স্ত্রী হিসেবে যেকোনো পরিস্থিতিতেই সে টাকা পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু সালিশে বিজ্ঞজনরা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলেন, ইসলামি শরিয়াহ বা রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী স্ত্রী যদি কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই অবাধ্য (নাশেযা) হয় এবং দাম্পত্য জীবন বজায় রাখতে অস্বীকার করে, তবে স্বামী তাকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নয়।

অধিকার কেবল একতরফা নয়, এটি পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ওপর টিকে থাকে। ভুল বুঝতে পেরে সায়মা তার জেদ ত্যাগ করে ঘরে ফিরে আসে। চলুন, এই বিষয়ে আমাদের দেশের আইন কী বলে, তা স্পষ্টভাবে জেনে নেওয়া যাক।

স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকার-

একজন স্বামী সাধারণ নিয়মে তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১ অনুযায়ী, স্বামীর, তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দেয়ার বাধ্যবাধকতা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত।

স্ত্রী কখন ভরণপোষণ পাবে (পৃথক স্থানে বসবাস করলেও)-

১. স্বামী তাঁর স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। স্ত্রীও তার স্বামীর কাছে থেকে ভরণপোষণ পেতে হকদার।

২. স্বামী যদি স্ত্রীর সঙ্গে অভ্যাসগতভাবে খারাপ ব্যবহার করে, গৃহত্যাগের নির্দেশ দেয়, তাড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে থাকে অথবা তাদের মধ্যকার আচার-আচরণ এরূপ পর্যায়ে পৌঁছায় যে, এটা নিরসন করা সম্ভব নয় বা স্বামীর গৃহে থাকলে আরও অসুবিধা এবং বিরোধের জন্ম দিবে, সে অবস্থায় স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে বসবাস না করেও ভরণপোষণ দাবি করতে।

৩. স্ত্রী যদি তার নিজ ধর্ম পালনে স্বামীর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন, তবে তিনি পৃথক বসবাসের অধিকার রাখেন এবং ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন। স্বামী যদি অন্য কোনো স্ত্রীর সাথে বসবাস করেন এবং প্রথম স্ত্রীর জন্য আলাদা ও মানসম্মত বাসস্থানের ব্যবস্থা না করেন, সেক্ষেত্রে স্ত্রী আলাদা থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী।

৪. স্ত্রী তার আশু দেনমোহর দাবি করলে উক্ত দেনমোহর স্বামী পরিশোধ না করলে স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে পৃথক বসবাস করতে থাকলেও স্বামী তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে। অর্থাৎ কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণে স্ত্রী আলাদা বসবাস করলে স্বামী ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। (মো. ইব্রাহিম হোসেন সরকার বনাম মোসা. সোলেমান্নেসা (১৯৬৭, ১৯ ডি এল আর পৃষ্ঠা ৭৫১)।

ব্যতিক্রম: বাংলাদেশের মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন এক আদেশে ‘মিতা খান বনাম হেমায়েত বিবি, ১৪ ডিএলআর (হাইকোর্ট) ২০২৩’ নিম্নলিখিত প্রেক্ষপটে স্ত্রী ভরণপোষণ পাবার যোগ্যতা হারাবে। যথা-

১. স্ত্রী স্বামীর নিষেধাজ্ঞা সত্বেও যেখানে স্বামী অবস্থান করে সেখানে ভিন্ন অন্যত্র বসবাস করলে।

২. স্ত্রী বন্দিদশায় থাকলে। তবে স্বামী বন্দিদশায় থাকলে স্ত্রী ভরণপোষন হতে বঞ্চিত হবে না।

৩. স্ত্রী অন্যায়ভাবে অবাধ্য হয়ে স্বামীর অনুমতি ছাড়া অসংগত কারণে স্বামীর গৃহ ত্যাগ করল।

৪. স্ত্রী ধর্মত্যাগ করলে।

৫. স্ত্রীর অবাধ্যাচারণে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে।

৬. স্বামীর মৃত্যুজনিত কারণে ইদ্দত পালনরত থাকলে; তবে শর্ত হলো যে, বিধবা অন্তঃসত্তা হলে গর্ব খালাস না অবধি খোরপোষ পাবে; এবং

৭. স্ত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে গেলে।

স্ত্রীর ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ- ভরণপোষণের পরিমাণ স্বামী-স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সংগতির ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় নিকাহনামায় উল্লেখ থাকে, স্বামী মাসিক কত টাকা ভরণপোষণ হিসেবে দেবেন। সাধারণ অবস্থায় স্বামী তার নিজ গৃহেই স্ত্রী বা স্ত্রীদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি দিয়ে থাকেন। আইনসংগত বা যুক্তিযুক্ত কারণে যখন স্ত্রী আলাদা বসবাস করেন, তখন স্বামী নগদ অর্থ দ্বারা ভরণপোষণ জোগাবেন। [প্রতিবেদনটি তৈরিতে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সহায়তা নেয়া হয়েছে]।

আপনার করণীয়-
মনে রাখবেন, আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপনও ভিন্ন হবে। ‘আইনগত কারণ’ বা ‘যুক্তিসঙ্গত কারণ’ আদালতে প্রমাণের ওপর নির্ভর করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top