ঘর না ছেড়েই কি স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের বিচার পাওয়া সম্ভব?
বাবা-মায়ের ঘর ছেড়ে আসার সময় প্রতিটি নারী স্বপ্ন দেখেন একটি সাজানো সংসারের। কিন্তু সেই সাজানো সংসারে যখন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সংবাদ আসে, “স্বামী আপনাকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন”, তখন অনেক নারীই দিশেহারা হয়ে পড়েন।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের সমাজের নারীরা মনে করেন, এই অন্যায়ের বিচার পেতে হলে হয়তো তাকে ঘর ছাড়তে হবে, অথবা ডিভোর্স দিতে হবে। কিন্তু হঠকারী সিদ্ধান্তে একটি সাজানো সংসার থেকে হুট করে বেরিয়ে যাওয়া একজন নারীর জন্য কতটা অসহায়ত্বের এবং নিরাপত্তাহীনতার, তা কেবল তিনিই বোঝেন। বিশেষ করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর সামাজিক পরিচিতির কথা ভেবে অনেকেই মুখ বুজে সহ্য করেন।
কিন্তু আপনি কি জানেন? স্বামীর সংসারে থেকেই, ডিভোর্স না দিয়েও এই প্রতারণার বিচার পাওয়া এবং নিজের অধিকার আদায় করা আইনত সম্ভব। চলুন জেনে নিই, একজন আইনজীবীর দৃষ্টিতে আপনার প্রতিকারগুলো কী কী?
আইনি ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা: অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহের পরিণতি-
বাংলাদেশের আইন এবং ধর্মীয় বিধিবিধান, উভয়ই স্বামীর বহুবিবাহের অধিকারকে সুনির্দিষ্ট শর্তের অধীনে রেখেছে।
১. রাষ্ট্রীয় আইনের কঠোরতা (১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ): মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৬ অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি এবং সালিসি পরিষদের লিখিত অনুমোদন ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দণ্ড: এই আইন লঙ্ঘন করলে স্বামীর ১ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
তাৎক্ষণিক দেনমোহর পরিশোধ: স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার সাথে সাথেই প্রথম স্ত্রীর কাবিননামায় উল্লিখিত সম্পূর্ণ দেনমোহর (উসুলকৃত হোক বা না হোক) তৎক্ষণাৎ পরিশোধযোগ্য হয়ে যায়। স্ত্রী সংসারে থেকেই এই টাকা আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন।
২. ধর্মীয় প্রেক্ষাপট ও সমতা:
ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত হলো সকল স্ত্রীর মধ্যে ‘আদল’ বা ইনসাফ নিশ্চিত করা। স্বামী যদি আপনার অনুমতি না নিয়ে গোপনে বিয়ে করেন এবং আপনার প্রতি বৈষম্য করেন, তবে তিনি ধর্মীয়ভাবেও অপরাধী। যদিও আলোচনার প্রয়েজনে দ্বিতীয় বিয়ে প্রসঙ্গে ধর্মীয় বিধি বিধানের কথা বলা হলো। বাস্তবিক অর্থে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রীয় আইন প্রযোজ্য। অর্থাৎ সালিসি পরিষদ ও বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের অনুমতি লাগবে।
৩. ভরণপোষণ ও আলাদা থাকার অধিকার:
আপনি যদি স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের পর তার সাথে একই ছাদের নিচে থাকা মানসিক যন্ত্রণার কারণ মনে করেন, তবে আপনি ঘর না ছেড়েই পৃথকভাবে থাকার এবং আপনার ও সন্তানদের জন্য উপযুক্ত ভরণপোষণ (Maintenance) দাবি করে মামলা করতে পারেন। আইন অনুযায়ী স্বামী আপনাকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।
মূল বার্তা: স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে মানেই আপনার সব অধিকার শেষ নয়। আপনি স্বামীর ঘর না ছেড়েই আইনি উপায়ে তাকে শাস্তির মুখোমুখি করতে পারেন এবং নিজের পাওনা আদায় করতে পারেন।
আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আপনার ও আপনার সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সঠিক আইনি কৌশল নির্ধারণের জন্য অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।