“কাবিনের টাকা কি শুধু তালাক হলে পাওয়া যাবে, এটাই কি নিয়ম?” কয়েকদিন আগের ঘটনা এটি। শপিং মলে এক পরিচিত দম্পতির সঙ্গে দেখা। হাসিমুখে কথা বলার এক ফাঁকে স্ত্রীটি আমাকে একটু আড়ালে ডেকে ফিসফিস করে জানতে চাইলেন। তার এই সহজ অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আমাকে এক মুহূর্তে স্তম্ভিত করে দিল!
এই দম্পতির সুখী চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই যে তাদের দাম্পত্য জীবনে কতটা টানাপোড়েন চলছে। তারা ভাবছেন, কাবিননামার বিশাল অঙ্কটি কেবল তালাক হলেই দাবি করা যায়। তাদের এই ভুল ধারণা আমাকে বাধ্য করেছে এই বিষয়টি নিয়ে সবার সামনে কথা বলতে। আমাদের সমাজে অসংখ্য নারী মনে করেন, দেনমোহর শুধু তালাক হলেই প্রাপ্য। তাহলে আসল সত্যটা কী?
এই ধারণাটি কেবল ভুলই নয়, অনেক ক্ষেত্রে নারীকে তার আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। কাবিন বা দেনমোহর, হলো একটি আর্থিক সুরক্ষা, যা বিয়ের সময় নির্ধারিত হয়। এটি কোনো তালাক-পরবর্তী আর্থিক দেনা নয় বরং বিয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বামী ও স্ত্রী দুজনই কাবিননামার শর্তে আবদ্ধ থাকেন এবং এর সঙ্গে তালাকের কোনো সম্পর্ক নেই।
কাবিন ও এর আইনি ব্যাখ্যা-
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, দেনমোহর বা কাবিন হলো স্ত্রীর একটি আইনগত অধিকার, যা বিয়ের চুক্তি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই সৃষ্টি হয়।
তাৎক্ষণিক দেনমোহর (Prompt Mahr): কাবিননামায় দেনমোহরের যে অংশটি তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধের জন্য নির্ধারিত হয়, সেটি স্ত্রী যেকোনো সময় দাবি করতে পারেন। তালাক হোক বা না হোক, স্ত্রী এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন না।
বিলম্বিত দেনমোহর (Deferred Mahr): কাবিনের যে অংশটি পরবর্তীতে পরিশোধের জন্য নির্ধারিত হয়, তা সাধারণত তালাক হলে বা স্বামীর মৃত্যুর পর প্রদানযোগ্য হয়। বাংলাদেশের বর্তমান যে কাবিননামা বা বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ফর্ম প্রচলিত, তার ১৮ নং কলামে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, ‘দেন মোহরের কী পরিমাণ মুয়াজ্জল এবং কী পরিমাণ মু’অজ্জল?
আদায়ের অধিকার: যদি স্বামী দেনমোহরের টাকা পরিশোধ না করেন, তবে স্ত্রী স্বামীর জীবিত অবস্থায় যেকোনো সময় তা আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। এই মামলা করার জন্য তালাক হওয়া আবশ্যক নয়। বরং এ কথা মনে রাখা দরকার যে, দেনমোহরও স্বামীর উপর অন্যান্য ঋণের ন্যায় স্ত্রীর এক প্রকার ঋণ; যাকে বলা হয় বাধ্যতামূলক ঋণ।
তার এ কথা কোন দ্বিধা না রেখেই আপনাকে মানতে হবে, দেনমোহর বিয়ের সাথে সম্পর্কিত, এবং এটি বিবাহের অনিবার্য ও অলঙ্ঘনীয় একটি চুক্তি। এই চুক্তি নারীর অধিকার নিশ্চিত করে এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা দেয়। তাই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না।
আপনার করণীয়
আইনি পরামর্শ: আপনার যদি দেনমোহর সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন। তিনি আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক আইনি পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবেন।
সচেতন হোন: কাবিননামা রেজিস্ট্রেশনের সময় দেনমোহরের ধরন (তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত) এবং পরিমাণ সম্পর্কে সচেতন থাকুন। নিজে সময় নিয়ে পড়ে তারপর কাবিননামায় স্বাক্ষর করবেন এবং অবশ্যই এর পূর্বে দেনমোহর নির্ধারণের পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নিন। এ সম্পর্কে পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।
আপনার যদি এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন প্রয়োজনে হোয়াটসঅ্যাপে 01715 747 777 মেসেজে যোগাযোগ করতে পারেন।