বাবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কি সন্তান হেফাজতের একমাত্র মানদণ্ড?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “বাবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কি সন্তান হেফাজতের একমাত্র মানদণ্ড?” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

টাকা থাকলেই কি ভালো বাবা বা মা হওয়া যায়? সন্তান কার কাছে থাকবে, তা কি শুধু ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে ঠিক হয়?

পারিবারিক বিরোধের জেরে যখন সন্তানের হেফাজত বা জিম্মা (Custody) নিয়ে আইনি লড়াই শুরু হয়, তখন আমাদের সমাজে একটি বড় আতঙ্ক দেখা দেয়। বিশেষ করে মায়েরা ভাবেন, “আমার তো অঢেল টাকা নেই, বাবার অনেক সম্পদ, তাহলে কি আদালত আমার সন্তানকে কেড়ে নেবে?” চলুন আজ এই ভুল ধারণাটি পরিষ্কার করে নেয়া যাক।

আমার চেম্বারে আসা এক মায়ের ঘটনাই বলি। বিচ্ছেদের পর তিনি সন্তানের কাস্টডি নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ছিলেন। সন্তানের বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, যার বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি সবই আছে। মামলায় বাবার প্রধান যুক্তি ছিল, “মায়ের আয়ের কোনো উৎস নেই, তাই সন্তানের ভবিষ্যৎ আমার কাছেই সুরক্ষিত।”

কিন্তু শুনানিতে যখন বিস্তারিত উঠে এলো, দেখা গেল বাবা ব্যবসার কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, সন্তানকে দেওয়ার মতো কোনো সময়ই তার নেই; শিশুটি মূলত গৃহকর্মীদের কাছে বড় হচ্ছিল।

অন্যদিকে, মা আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও তিনি সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে সক্ষম। সন্তানের পড়াশোনা দেখাতে এবং মানসিক ও আবেগিক সংযোগ মায়ের সাথেই সবচেয়ে গভীর হবার সম্ভাবনা ছিল। আদালত শেষ পর্যন্ত বাবার বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে নয়, বরং মায়ের সময়, যত্ন ও সুন্দর পরিবেশকে প্রাধান্য দিয়ে সন্তানের জিম্মা মায়ের কাছেই রাখার আদেশ দেন।

আইনগত ও বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা:
বাংলাদেশে সন্তানদের অভিভাবকত্ব ও জিম্মা সংক্রান্ত বিষয়ে The Guardians and Wards Act, 1890 প্রযোজ্য হয়। এই আইনের মূল ভিত্তি হলো “Welfare of the Minor” বা সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ।

আদালত এখন শুধু মা বা বাবার ব্যাংক ব্যালেন্স বা বস্তুগত সম্পদ দেখে সিদ্ধান্ত নেন না। অর্থনৈতিক সক্ষমতা অবশ্যই একটি উপাদান, কিন্তু এটি একমাত্র বা প্রধান মানদণ্ড নয়।

আদালত কাস্টডি দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কঠোরভাবে বিবেচনা করেন:
১. সময় ও উপস্থিতি: মা কিংবা বাবার মধ্যে কে সন্তানকে গুণগত সময় (Quality Time) দিতে পারছেন?

২. আবেগিক সংযোগ (Emotional Bonding): সন্তান মানসিকভাবে কার ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং কার কাছে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বোধ করে?

৩. নৈতিক ও মানসিক বিকাশ: কার তত্ত্বাবধানে থাকলে সন্তান একটি সুস্থ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে বড় হতে পারবে?

৪. ভরণপোষণের দায়িত্ব: আইন অনুযায়ী, সন্তান মায়ের জিম্মায় থাকলেও তার প্রয়োজনীয় ভরণপোষণ (Maintenance) দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা কিন্তু বাবারই থাকে। তাই মা অসচ্ছল হলেও কেবল সেই কারণে তিনি সন্তান হারাবেন না।

সচেতনতামূলক বার্তা: টাকা দিয়ে সন্তানের প্রয়োজনীয়তা কেনা যায়, কিন্তু তার শৈশবের মানসিক নিরাপত্তা ও ভালোবাসা কেনা যায় না। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতও বিভিন্ন রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, ধন-সম্পদের চেয়ে শিশুর মানসিক ও নৈতিক কল্যাণই আদালতের কাছে প্রথম বিবেচ্য। তাই আপনার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেই সন্তান হাতছাড়া হয়ে যাবে, এই ভয়ে আইনি লড়াই থেকে পিছিয়ে যাবেন না।

আপনার জন্য পরামর্শ: আইন সবার জন্য এক হলেও প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট, পারিপার্শ্বিকতা ও প্রমাণাদি ভিন্ন হয়। তাই যেকোনো প্রতিকারের জন্য একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করা আবশ্যক। ওপরের আলোচনাটি সাধারণ সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।

Share the Post:
Scroll to Top