প্রিয় পাঠক, মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় স্ত্রীকে ভরণপোষণ বা খোরপোশ দেওয়া স্বামীর ওপর একটি আইনি ও ধর্মীয় বাধ্যতামূলক ঋণ। তবে এই নিয়মের পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত এবং ব্যতিক্রম রয়েছে। আইন কোনো একতরফা অন্ধ নিয়ম মেনে চলে না; বরং অধিকার এবং কর্তব্যের ভারসাম্য রক্ষা করে।
১. আইনের সাধারণ নীতি: অবাধ্য হলে খোরপোশ পাওয়ার অধিকার থাকে না
মুসলিম পারিবারিক আইনের সাধারণ নীতি অনুযায়ী, ভরণপোষণ পাওয়ার জন্য স্ত্রীকে স্বামীর প্রতি অনুগত থাকতে হয় এবং যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা চলে না।
আইনি ভাষায় কোনো স্ত্রী যদি কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই স্বামীর ঘর ত্যাগ করেন বা স্বামীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখতে অস্বীকার করেন, তবে তাকে ‘নাশেজা’ (Nashizah) বা অবাধ্য স্ত্রী বলা হয়। স্ত্রী যদি সুনির্দিষ্ট এবং আইনসংগত কোনো কারণ ছাড়া স্বেচ্ছায় অবাধ্য হন, তবে স্বামী তাকে ভরণপোষণ দিতে আইনত বাধ্য নন।
২. ‘অবাধ্যতা’ কখন আইনসংগত বা গ্রহণযোগ্য? (স্ত্রীর বিশেষ সুরক্ষা)
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় আইনি মোড় বা রহস্য! স্বামী বললেই আদালত কোনো স্ত্রীকে ‘অবাধ্য’ হিসেবে গণ্য করে না। যদি স্ত্রী প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি সুনির্দিষ্ট কিছু আইনসংগত কারণে স্বামীর ঘর ছেড়েছেন বা আলাদা থাকছেন, তবে আলাদা থাকা সত্ত্বেও স্বামী তাকে খোরপোশ দিতে ১০০% বাধ্য থাকবেন।
কিছু কারণ নিম্নে প্রদত্ত হলো –
শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন: স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন যদি স্ত্রীর ওপর নিষ্ঠুর আচরণ (Cruelty) বা নির্যাতন করেন এবং সেই ঘরে থাকা যদি স্ত্রীর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়।
দেনমোহর পরিশোধ না করা: বিয়ের পর স্ত্রী যদি তার ‘তাৎক্ষণিক দেনমোহর’ (Prompt Dower) দাবি করেন এবং স্বামী তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন বা অস্বীকার করেন; তবে দেনমোহর আদায়ের অধিকার হিসেবে স্ত্রী স্বামীর থেকে দূরে বা বাপের বাড়িতে থাকতে পারেন। এই অবস্থায় আলাদা থাকলেও স্বামী খোরপোশ দিতে বাধ্য।
অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে: স্বামী যদি প্রচলিত আইন (সালিসি পরিষদের অনুমতি) অমান্য করে বা প্রথম স্ত্রীর অমতে গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে প্রথম স্ত্রী আলাদা থাকার পূর্ণ আইনি অধিকার লাভ করেন এবং আলাদা থাকলেও স্বামী তাকে খোরপোশ দিতে বাধ্য।
বাসস্থানের নিরাপত্তা না দেওয়া: স্বামী যদি স্ত্রীকে একটি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং তার সামর্থ্য অনুযায়ী স্বাধীন বাসস্থান (আলাদা ঘর) দিতে ব্যর্থ হন।
৩. আদালত কীভাবে ‘অবাধ্যতা’ নির্ধারণ করে?
একটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটা বোঝানো যাক। স্বামী যদি মনে করেন স্ত্রী কোনো কারণ ছাড়াই বাপের বাড়িতে বসে আছেন এবং খোরপোশের মামলা করেছেন, তবে স্বামীকে পারিবারিক আদালতে (Family Court) প্রমাণ করতে হবে যে তিনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন কিন্তু স্ত্রী কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই আসছেন না।
এক্ষেত্রে স্বামীরা সাধারণত পারিবারিক আদালতে ‘দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার’ (Restitution of Conjugal Rights)-এর মামলা করেন। এই মামলায় যদি প্রমাণিত হয় যে স্বামীর কোনো দোষ নেই, স্ত্রী স্রেফ নিজের ইচ্ছায় সংসার করছেন না, কেবল তখনই আদালত স্ত্রীকে অবাধ্য ঘোষণা করতে পারেন এবং স্বামীর খোরপোশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সাময়িকভাবে মকুফ হতে পারে।
৪. সন্তানের খোরপোশ সম্পূর্ণ আলাদা
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি। স্ত্রী অবাধ্যতার কারণে নিজের খোরপোশের অধিকার হারালেও, তার সাথে থাকা সন্তানদের ভরণপোষণের অধিকার কিন্তু কখনো নষ্ট হয় না। মা বাপের বাড়িতে থাকুক বা আলাদা থাকুক, সন্তানের বাবা হিসেবে সন্তানদের ভরণপোষণ, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ স্বামীকে নিয়মিত দিয়ে যেতেই হবে।
সহজ কথায়, কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া স্ত্রী যদি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় স্বামীর নির্দেশ অমান্য করে আলাদা থাকেন বা দাম্পত্য জীবন বজায় না রাখেন, তবে আইন অনুযায়ী স্বামী তাকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন। কিন্তু স্বামীর নির্যাতন, দ্বিতীয় বিয়ে বা দেনমোহর না দেওয়ার কারণে যদি স্ত্রী আলাদা থাকেন, তবে তাকে ‘অবাধ্য’ বলা যাবে না এবং স্বামী তার খোরপোশ দিতে সম্পূর্ণ বাধ্য থাকবেন।