প্রিয় পাঠক,
আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, কোনো ডিভোর্সি বা বিধবা নারী দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেই তার আগের পক্ষের সন্তানের ওপর তার আর কোনো অধিকার থাকে না, বাবা বা দাদা পক্ষ এসে সহজেই সন্তানকে কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের আইন কি আসলেই এতটা নিষ্ঠুর? চলুন আসল আইনি মারপ্যাঁচ ও সত্যটি জেনে নিই।
১. ‘অভিভাবকত্ব’ (Guardianship) বনাম ‘হেফাজত’ (Custody/Hizanat)
এই বিষয়টি বুঝতে হলে সবার আগে আইনের দুটি বিশেষ পরিভাষা বুঝতে হবে:
আইনি অভিভাবক (Legal Guardian): মুসলিম আইন অনুযায়ী, সন্তানের শরীর ও সম্পত্তির মূল আইনি অভিভাবক সবসময়ই বাবা। বাবা বেঁচে না থাকলে তার নির্ধারিত ব্যক্তি বা দাদা এই দায়িত্ব পান।
জিম্মাদার বা হেফাজত (Custody/Hizanat): সন্তান কার কাছে থাকবে, কার কোলে বড় হবে, কার যত্নে থাকবে —একে বলা হয় ‘হেফাজত’ বা জিম্মাদারি। আর এই হেফাজতের প্রাথমিক ও প্রধানতম অধিকারী হলেন মা। স্বাভাবিক নিয়মে ছেলে সন্তান ৭ বছর এবং মেয়ে সন্তান বয়ঃসন্ধি বা বিয়ে পর্যন্ত মায়ের হেফাজতে থাকে।
২. দ্বিতীয় বিয়ে করলে কি মায়ের হেফাজতের অধিকার চলে যায়?
মুসলিম আইনের সাধারণ নীতি অনুযায়ী, মা যদি এমন কোনো পুরুষকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন যিনি সন্তানের জন্য ‘রক্ত সম্পর্কীয় নিষিদ্ধ স্তরের’ (Mahram) কেউ নন (যেমন: সৎ বাবা যদি সন্তানের আপন চাচা না হন), তবে তাত্ত্বিকভাবে মায়ের হেফাজতের অধিকার খর্ব হতে পারে।
কিন্তু (এখানেই সবচেয়ে বড় আইনি মোড়): বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইন এবং আদালত এই শুষ্ক নিয়মকে হুবহু অন্ধের মতো প্রয়োগ করে না।
৩. আদালতের মূল চাবিকাঠি: ‘সন্তানের সর্বোচ্চ কল্যাণ’ (Welfare of the Child)
বাংলাদেশের পারিবারিক আদালতগুলো ‘গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০’ (The Guardians and Wards Act, 1890) অনুযায়ী সন্তানের হেফাজতের বিষয়টি ফয়সালা করেন। এই আইনের মূল কথাই হলো— “সন্তানের সর্বোচ্চ কল্যাণ ও মঙ্গল কিসে?” (Welfare of the minor is the paramount consideration).
বিজ্ঞ আদালত যেকোনো মামলায় মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের চেয়ে সন্তানের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তাকে শতগুণ বেশি প্রাধান্য দেন।
আদালত দেখেন:
সৎ বাবার পরিবারে সন্তানটি কেমন আছে? সৎ বাবা যদি সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসেন এবং মা যদি সন্তানকে সুশিক্ষা দিতে পারেন, তবে আদালত সন্তানকে মায়ের কাছেই রাখেন।
অন্যদিকে, বাবা যদি দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলেন এবং তার ঘরে নতুন সৎ মা থাকে, তবে আদালত খুব ভালো করেই জানেন যে বাবার চেয়ে মায়ের কাছেই সন্তান বেশি নিরাপদ।
সন্তান যদি কিছুটা বুঝতে শেখার বয়সে পৌঁছায় (সাধারণত ৭ বছরের ওপরে), তবে বিজ্ঞ বিচারক স্বয়ং সন্তানকে খাস কামরায় ডেকে তার মতামত নেন যে, সে কার কাছে থাকতে চায়। সন্তান যদি মায়ের কাছে থাকতে চায়, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তি তাকে মায়ের কোল থেকে আলাদা করতে পারে না।
৪. উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নজির (Judicial Precedents)
বাংলাদেশের মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্ট বিভাগ বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কেবল দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণেই একজন মাকে তার সন্তানের হেফাজত থেকে বঞ্চিত করা যাবে না, যদি মায়ের কাছে থাকাই সন্তানের জন্য সবচেয়ে বেশি মঙ্গলজনক হয়। উচ্চ আদালত মুসলিম আইনের কঠোর প্রথাগত নিয়মকে শিথিল করে মায়ের অধিকারকে সুরক্ষা দিয়েছেন।
৫. দ্বিতীয় বিয়ে করলেও বাবার দায়িত্ব শেষ হয় না
মা দ্বিতীয় বিয়ে করে সন্তানকে নিজের কাছে রাখলেও, সন্তানের আসল বাবা কিন্তু তার দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। আইন অনুযায়ী, সন্তানের নিয়মিত ভরণপোষণ, পড়াশোনা ও চিকিৎসার সমস্ত খরচ বাবাকেই বহন করতে হবে।
মা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, এই অজুহাতে বাবা সন্তানের খোরপোশ দেওয়া বন্ধ করতে পারবেন না। বন্ধ করলে মা পারিবারিক আদালতে মামলা করে বাবার কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারবেন।
বস্তুত, মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে মানেই সন্তানের অধিকার হারানো নয়। আইন কোনো মাকে তার নিজের সুখের খোঁজে নতুন জীবন শুরু করার অপরাধে সন্তান কেড়ে নেওয়ার শাস্তি দেয় না। রাষ্ট্র ও আদালতের কাছে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎই শেষ কথা। তাই কোনো মায়েরই এই আইনি অজ্ঞতার ভয় বা সামাজিক ফতোয়ার মুখে নিজের জীবনকে বন্দি রাখা উচিত নয়।