প্রিয় পাঠক,
সম্পর্ক যখন শুধু যান্ত্রিকতায় রূপ নেয়, তখন কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই একসাথে থাকাটা এক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোতে এই ‘ভালো না লাগা’ বা ‘মানসিক অমিল’ (Incompatibility)-কে কীভাবে দেখা হয়, চলুন তা জেনে নিই।
১. স্বামীর ক্ষেত্রে: কোনো কারণ ছাড়াই তালাকের অধিকার
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, একজন পুরুষ বা স্বামীর একতরফা তালাক দেওয়ার অধিকার (তালাক-ই-আহসান) রয়েছে।
স্বামী যদি মনে করেন যে, স্ত্রীর কোনো আচরণ তার আর ‘ভালো লাগছে না’ বা তাদের মধ্যে মানসিক মিল হচ্ছে না, তবে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ (যেমন: পরকীয়া বা অপরাধ) ছাড়াই স্ত্রীকে তালাকের নোটিশ পাঠাতে পারেন।
আইন স্বামীকে তার তালাকের সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো কৈফিয়ত বা কারণ দর্শাতে বাধ্য করে না। তবে স্বামী ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৭ ধারা অনুযায়ী নোটিশ দিয়ে এই ‘ভালো না লাগা’র কারণে তালাক দিতে পারলেও, তাকে স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর এবং ইদ্দতকালীন খোরপোশ এককালীন পরিশোধ করতে হবে।
২. স্ত্রীর ক্ষেত্রে: কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতা
কোনো স্ত্রীর যদি স্বামীকে আর ‘ভালো না লাগে’, তবে তিনি সরাসরি তালাক দিতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করে তার বিয়ের চুক্তির ওপর।
যদি ১৮ নম্বর কলামে ক্ষমতা দেওয়া থাকে: বিয়ের সময় কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে যদি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার (তালাক-ই-তৌফিজ) দেওয়া হয়ে থাকে এবং সেখানে কোনো বিশেষ শর্ত না থাকে, তবে স্ত্রীও স্বামীর মতো কেবল “ভালো লাগে না” বা “আমি আর এই সংসারে সুখী নই” -এই মানসিক কারণ দেখিয়ে স্বামীকে তালাকের নোটিশ পাঠাতে পারেন। এক্ষেত্রে তাকে আদালতে কোনো প্রমাণ দেখাতে হবে না এবং তিনি তার দেনমোহরের টাকাও সম্পূর্ণ পাবেন।
৩. কাবিননামায় ক্ষমতা না থাকলে: আদালতের কঠিন বাস্তব
যদি কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া না থাকে, এবং স্ত্রী কেবল ‘ভালো লাগে না’ এই অজুহাতে পারিবারিক আদালতে (Family Court) বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করেন, তবে আইন তাকে সরাসরি কোনো প্রতিকার দেবে না।
১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী, আদালতে মামলা করে ডিভোর্স পেতে হলে স্ত্রীকে সুনির্দিষ্ট কারণের যেকোনো একটি প্রমাণ করতে হয় (যেমন: ২ বছর খোরপোশ না দেওয়া, ৪ বছর নিখোঁজ থাকা বা শারীরিক-মানসিক নির্যাতন)।
আদালতে গিয়ে যদি স্ত্রী বলেন, “স্বামী আমাকে মারধর করে না, খোরপোশও দেয়, কিন্তু তাকে আমার ভালো লাগে না”—তবে বিজ্ঞ আদালত সেই মামলা খারিজ (Dismiss) করে দিতে পারেন। কারণ রাষ্ট্রীয় আইনে কেবল ‘ভালো না লাগা’ কোনো মামলার গ্রাউন্ড বা কারণ হতে পারে না। যদিও পুরোটা নির্ভর করছে আদালতের উপর।
৪. ‘খুলা’ (Khula) বা সমঝোতার পথ
আদালতে প্রমাণ করার মতো কারণ না থাকলেও যদি স্ত্রী কোনোভাবেই স্বামীর সাথে সংসার করতে না চান, তবে তিনি ‘খুলা’ বা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন।
এক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীকে বলবেন যে, “তোমাকে আমার ভালো লাগছে না, আমি এই বিয়ে থেকে মুক্তি চাই।”
বিনিময়ে স্ত্রী তার দেনমোহরের টাকা আংশিক বা সম্পূর্ণ ত্যাগ করার প্রস্তাব দিতে পারেন। স্বামী যদি এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে সই করেন, তবেই কেবল বিচ্ছেদ সম্ভব। স্বামী রাজি না হলে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে দেনমোহর ত্যাগ করার শর্তে ‘খুলা’র ডিক্রি নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন, যা বিজ্ঞ আদালতের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে।
সহজ কথায়— ‘ভালো লাগে না’ শব্দগুলো স্বামীর ক্ষেত্রে তালাকের নোটিশ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু স্ত্রীর ক্ষেত্রে এটি তখনই কারণ হতে পারে, যদি তার কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া থাকে। যদি সেই ক্ষমতা না থাকে, তবে কেবল ‘ভালো না লাগা’র ওপর ভিত্তি করে স্ত্রী একতরফা আইনি বিচ্ছেদ নাও পেতে পারেন, তাকে হয় সমঝোতার (খুলা) পথ খুঁজতে হবে, নয়তো আদালতে অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ প্রমাণ করতে হবে।