‘মৌখিক তালাক’ এবং ‘আইনি তালাক’ কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “‘মৌখিক তালাক’ এবং ‘আইনি তালাক’ কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

‘মৌখিক তালাক’ এবং ‘আইনি তালাক’ কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ?

প্রিয় পাঠক, দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে অপ্রিয় শব্দ ‘তালাক’। কিন্তু এই তালাক দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে সমাজে প্রতিনিয়ত ভুল ধারণার কারণে হাজার হাজার নারী ও পরিবার আইনি ও সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। চলুন জেনে নিই বাংলাদেশের প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আইনের চোখে কোনটির অবস্থান ঠিক কোথায়।

১. মৌখিক তালাক (Oral Divorce): আইনের চোখে সম্পূর্ণ অবৈধ ও অকার্যকর
রাগের মাথায়, ঝোঁকের বশে কিংবা কোনো পারিবারিক সালিশে মুখ দিয়ে ‘তালাক’ বা ‘তিন তালাক’ উচ্চারণ করাকে সমাজে অনেকে কার্যকর মনে করলেও, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনের চোখে মৌখিক তালাক সম্পূর্ণ অবৈধ ও মূল্যহীন।

আইনের স্পষ্ট ধারা: ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’-এর ৭ ধারা অনুযায়ী, কেবল মুখে ‘তালাক’ উচ্চারণ করলে বা কাগজে লিখে ঘরে ফেলে রাখলে আইনগতভাবে কোনো তালাক সম্পন্ন হয় না।

শাস্তির বিধান: কোনো স্বামী যদি আইনি প্রক্রিয়া না মেনে স্ত্রীকে মৌখিকভাবে তালাক দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেন বা সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তবে তিনি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ করছেন। আইন অমান্য করার কারণে স্বামীর ১ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

সম্পর্কের স্থায়িত্ব: মুখে হাজার বার তালাক বললেও আইনের চোখে আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক এক বিন্দুও নষ্ট হয়নি। আপনারা আগের মতোই আইনত স্বামী-স্ত্রী থাকবেন এবং স্ত্রী তার ভরণপোষণ ও সমস্ত অধিকার দাবি করতে পারবেন।

২. আইনি তালাক (Legal Divorce): একমাত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ পদ্ধতি
বাংলাদেশে যেকোনো মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদকে রাষ্ট্রীয় ও আইনগতভাবে বৈধতা পেতে হলে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৭ ধারা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। এই পদ্ধতি মেনে যে তালাক দেওয়া হয়, তাকেই আইনি তালাক বলা হয় এবং এটিই একমাত্র বৈধ উপায়।

আইনি তালাক সম্পূর্ণ হতে ৩টি বাধ্যতামূলক ধাপ পার হতে হয়:
১. লিখিত নোটিশ: তালাক দিতে ইচ্ছুক পক্ষকে (স্বামী বা ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতাবলে স্ত্রী) প্রথমে লিখিতভাবে একটি নোটিশ তৈরি করতে হবে।
২. স্থানীয় চেয়ারম্যানকে অবগতি: সেই নোটিশের একটি কপি কনে বা স্ত্রীর নিজ এলাকার স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান, মেয়র বা কাউন্সিলর কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।
৩. অপর পক্ষকে কপি প্রদান: একই নোটিশের আরেকটি অনুলিপি বা কপি রেজিস্ট্রি ডাকযোগে বা সরাসরি অপর পক্ষকে পাঠাতে হবে।

৩. ৯০ দিনের হিসাব ও সালিসি পরিষদ
চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে লিখিত নোটিশটি পৌঁছানোর দিন থেকে আইন অনুযায়ী ৯০ দিন (তিন মাস) সময় দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে স্থানীয় চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি ‘সালিসি পরিষদ’ গঠিত হয়, যার কাজ হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা।

তালাক কার্যকর হওয়া: এই ৯০ দিনের মধ্যে যদি কোনো আপস না হয় বা নোটিশ প্রত্যাহার করা না হয়, কেবল তখনই ৯০ দিন পার হওয়ার পর তালাকটি আইনগতভাবে চূড়ান্ত ও বৈধ হিসেবে কার্যকর হবে।

হিল্লা বিয়ের অবসান: এই আইনি প্রক্রিয়ায় তালাক কার্যকর হওয়ার পর যদি সেই দম্পতি আবার নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে একসাথে সংসার করতে চান, তবে কোনো প্রকার কুৎসিত ‘হিল্লা বিয়ে’ ছাড়াই তারা পুনরায় নতুন করে নিকাহ বা বিয়ে করতে পারবেন।

সহজ কথায়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনের কাছে মৌখিক তালাক সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং নিয়ম মেনে দেওয়া আইনি তালাকই একমাত্র বৈধ ও কার্যকর পদ্ধতি। মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে কোনো সুন্দর সংসার ভেঙে যেতে পারে না, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সুরক্ষায় কাগজের লিখিত প্রমাণ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক করেছে।

Share the Post:
Scroll to Top