প্রিয় পাঠক, আজ আমাদের সমাজের একটি অত্যন্ত অন্ধকার এবং স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোকপাত করছি। অনেক সময় রাগের মাথায় মৌখিক তালাক দেওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী ভুল বুঝতে পেরে আবার একসাথে সংসার করতে চাইলে, তথাকথিত ফতোয়াবাজরা ফতোয়া দেন যে- “স্ত্রীকে অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিয়ে (হিল্লা) দিয়ে, তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক সম্পন্ন করিয়ে, তারপর তাকে তালাক দিলেই কেবল প্রথম স্বামী আবার তাকে বিয়ে করতে পারবেন।”
আইনের স্পষ্ট এবং কঠোর জবাব হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনে হিল্লা বিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধ, অবৈজ্ঞানিক এবং একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ।
১. ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন কী বলে?
বাংলাদেশের প্রচলিত ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’-এর ৭(৫) ধারা অনুযায়ী, তালাক দেওয়ার পর (তা যে পক্ষই দিক এবং যেভাবেই কার্যকর হোক না কেন) যদি সেই স্বামী-স্ত্রী আবার নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে একত্রে সংসার করতে চান, তবে কোনো প্রকার হিল্লা বিয়ে বা অন্তর্বর্তীকালীন বিয়ে ছাড়াই তারা পুনরায় নতুন করে নিকাহ বা বিয়ে (Remarriage) করতে পারবেন।
আইন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তালাক কার্যকর হওয়ার পর প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিয়ে হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো হিল্লা বিয়ের শর্ত রাষ্ট্র দেয় না। আর যদি তালাকের নোটিশ দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যেই তাদের সমঝোতা হয়ে যায়, তবে তো নতুন কোনো বিয়েরও প্রয়োজন পড়ে না, নোটিশ প্রত্যাহার করলেই চলে।
২. জোরপূর্বক হিল্লা বিয়ে দিলে আইনি শাস্তি
যদি কোনো এলাকায় সমাজপতি, মাতব্বর বা ফতোয়াবাজরা জোর করে কোনো নারীকে হিল্লা বিয়ে করতে বাধ্য করেন, তবে সেটি প্রচলিত আইনে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ভুক্তভোগী নারী বা তার পরিবার নিচের আইনি পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০: জোরপূর্বক হিল্লা বিয়ে দেওয়া এবং অন্য পুরুষের সাথে শয্যাশায়ী হতে বাধ্য করা এই আইনের অধীনে গুরুতর অপরাধ। এর শাস্তি হিসেবে অপরাধীদের কঠোর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code): জোরপূর্বক বিয়ে, অন্যায়ভাবে আটকে রাখা (Wrongful Confinement) এবং নারীর শ্লীলতাহানির অপরাধে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরাসরি থানায় মামলা বা আদালতে সিআর (CR) মামলা করা যায়।
উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায়: বাংলাদেশের মহামান্য হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, আদালত ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা সালিসি কমিটি কোনো প্রকার ধর্মীয় ফতোয়া বা হিল্লা বিয়ের নির্দেশ দিতে পারবে না। ফতোয়া দেওয়া এবং তার মাধ্যমে কাউকে নির্যাতন করা আইনত নিষিদ্ধ।
৩. ইসলামি শরিয়াহর প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি
অনেকে ভাবেন হিল্লা বিয়ে বোধহয় ইসলামের নিয়ম। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ইসলামে হিল্লা বিয়ে বা আগে থেকে চুক্তি করে কাউকে তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে সাময়িক বিয়ে করাকে অভিশপ্ত ও সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি হিল্লা বিয়ে করে এবং যার জন্য হিল্লা বিয়ে করা হয়, উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত বা অভিশাপ।” পবিত্র কুরআনে (সুরা বাকারা, আয়াত ২৩০) যে বিয়ের কথা বলা হয়েছে, তা হলো একটি স্বাভাবিক ও স্থায়ী বিয়ে।
অর্থাৎ, কোনো নারী যদি তালাকের পর স্বাভাবিক নিয়মে অন্য কোথাও বিয়ে বসেন এবং সেই স্বামীও যদি কোনো কারণে তাকে স্বাভাবিকভাবে তালাক দেন বা মারা যান, কেবল তখনই তিনি প্রথম স্বামীকে বিয়ে করতে পারবেন। চুক্তিভিত্তিক হিল্লা বিয়ে ইসলাম সমর্থন করে না।
সহজ কথায়, হিল্লা বিয়ে একটি কুসংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় আইনে এটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো দম্পতি রাগের মাথায় বিচ্ছেদের পর আবার একসাথে হতে চাইলে আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী তারা সরাসরি নতুন কাবিননামা করে বিয়ে করতে পারেন। সমাজ বা ফতোয়ার ভয়ে কোনো নারীর জীবন ধ্বংস করা আইনের চোখে বড় অপরাধ।