প্রথম স্ত্রী কি স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকাতে পারেন?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “প্রথম স্ত্রী কি স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকাতে পারেন?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, মুসলিম আইনে পুরুষদের যেহেতু চারটি বিয়ে করার অনুমতি আছে, তাই স্বামী চাইলে যেকোনো সময় আরেকটি বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রীয় আইন প্রথম স্ত্রীর অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর। প্রথম স্ত্রী চাইলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে করার চেষ্টা রুখে দিতে পারেন।

১. আইন অনুযায়ী প্রথম স্ত্রীর মূল হাতিয়ার: সালিসি পরিষদ
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় কোনো স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তবে তিনি সরাসরি কোনো কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করতে পারবেন না। তাকে প্রথমে স্থানীয় সরকারের (চেয়ারম্যান/মেয়র) কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে এবং একটি ‘সালিসি পরিষদ’ (Arbitration Council) গঠন করতে হবে।

এই সালিসি পরিষদে প্রথম স্ত্রীর মনোনীত একজন প্রতিনিধি থাকবেন। প্রথম স্ত্রী বা তার প্রতিনিধি যদি এই পরিষদে যুক্তি ও প্রমাণসহ প্রমাণ করতে পারেন যে—

স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।

স্বামী প্রথম স্ত্রীর খোরপোশ বা অধিকার সঠিকভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছেন না।

অথবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম সংসারটি ধ্বংস হয়ে যাবে।

তবে সালিসি পরিষদ স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতি প্রত্যাখ্যান (Reject) করতে পারে। সালিসি পরিষদের লিখিত অনুমতি ছাড়া স্বামী কোনোভাবেই আইনি উপায়ে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না।

২. কাজী অফিসে ‘নিষেধাজ্ঞা’ বা আগাম নোটিশ জারি
যদি প্রথম স্ত্রী জানতে পারেন যে তার স্বামী সালিসি পরিষদের কোনো অনুমতি না নিয়েই গোপনে কোনো কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করার পাঁয়তারা করছেন, তবে তিনি দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন:

কাজীকে নোটিশ: স্ত্রী তার এলাকার বা যে এলাকায় বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেখানকার নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীদের লিখিতভাবে (আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে) জানাতে পারেন যে, সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া এই ব্যক্তির দ্বিতীয় বিয়ে রেজিস্ট্রি করা আইনত অপরাধ।

আইনি বাধ্যবাধকতা: আইন অনুযায়ী, কোনো কাজী যদি সালিসি পরিষদের অফিসিয়াল অনুমোদনপত্র ছাড়া কোনো পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন, তবে সেই কাজীর লাইসেন্স বাতিল হবে এবং তার নিজেরও জেল-জরিমানা হবে। তাই নোটিশ পাওয়ার পর কোনো কাজী এই বিয়ে পড়াতে রাজি হবেন না।

৩. আদালতের মাধ্যমে ‘স্থায়ী বা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা’ (Injunction)
যদি স্বামী সালিসি পরিষদের নিয়ম অমান্য করে জোরপূর্বক বা জালিয়াতি করে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য প্রস্তুত হন, তবে প্রথম স্ত্রী সরাসরি পারিবারিক আদালতে (Family Court) একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করতে পারেন।

এই মামলায় স্ত্রী আদালতের কাছে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের ওপর একটি ‘অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা’ (Temporary Injunction) জারির আবেদন করতে পারেন।

বিজ্ঞ আদালত যদি স্ত্রীর বক্তব্য এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করে সন্তুষ্ট হন, তবে আদালত আদেশ জারি করে বলতে পারেন, “মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বা আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্বামী কোনো দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না।” আদালতের এই আদেশ অমান্য করে বিয়ে করলে স্বামীকে সরাসরি আদালত অবমাননার দায়ে জেলে যেতে হবে।

৪. নিয়ম অমান্য করে বিয়ে করে ফেললে প্রতিকার কী?
যদি স্ত্রী কোনোভাবে টের পাওয়ার আগেই স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়েটি সম্পন্ন করে ফেলেন, তাহলেও আইন প্রথম স্ত্রীকে ছেড়ে দেয়নি। সেক্ষেত্রে স্ত্রী নিচের ৩টি শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে পারেন:

তাৎক্ষণিক ফৌজদারি মামলা: সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করায় স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় স্বামীর ১ বছর পর্যন্ত জেল এবং ১০,০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে।

দেনমোহর আদায়: দ্বিতীয় বিয়ে করার সাথে সাথেই প্রথম স্ত্রীর সম্পূর্ণ বকেয়া দেনমোহর (তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত উভয়ই) একসাথে এককালীন পরিশোধ করা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।

আলাদা খোরপোশ: স্ত্রী চাইলে স্বামীর সাথে না থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থেকে স্বামীর খরচে জীবনযাপন করার আইনি অধিকার লাভ করেন।

সহজ কথায়, স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলেই তা পারেন না। প্রথম স্ত্রীর সম্মতি এবং সালিসি পরিষদের অনুমোদন ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। নারীরা যদি সঠিক সময়ে আইনের আশ্রয় নেন এবং আদালতের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন, তবে স্বামীর এই বেআইনি পদক্ষেপটি শুরুতেই আটকে দেওয়া সম্ভব।

Share the Post:
Scroll to Top