কোর্ট ম্যারেজের কোন বিধান কি আসলেই আছে?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “কোর্ট ম্যারেজের কোন বিধান কি আসলেই আছে?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, আজ আমাদের সমাজের একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর অথচ বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা নিয়ে আলোচনা করছি। অনেকেই ভাবেন, আদালতের মাধ্যমে বা কোনো আইনজীবীর চেম্বারে গিয়ে সই-স্বাক্ষর করে যে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ করা হয়, সেটিই বোধহয় সবচেয়ে শক্তিশালী বিয়ে। কিন্তু আইনের আসল সত্যটি শুনলে আপনি চমকে উঠবেন।

১. আইনি স্পষ্ট সত্য: ‘কোর্ট ম্যারেজ’ বলে আইনে কোনো শব্দ নেই
বাংলাদেশের প্রচলিত কোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি বা ধর্মীয় পারিবারিক আইনে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ (Court Marriage) বলে কোনো বিধান বা শব্দের অস্তিত্বই নেই। এটি সম্পূর্ণ একটি কাল্পনিক এবং সামাজিক পরিভাষা, যার কোনো নিজস্ব আইনি ভিত্তি নেই। আদালতের মাধ্যমে সরাসরি কোনো মুসলিম বা হিন্দু বিয়ে সম্পন্ন করার সুযোগ আইন আমাদের দেশে রাখেনি।

২. তাহলে ‘কোর্ট ম্যারেজ’-এর নামে আসলে কী করা হয়?
আমাদের সমাজে যেটিকে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ বলা হয়, সেটি মূলত একটি “হলফনামা” বা ডিক্লারেশন অব ম্যারেজ (Affidavit)।

নোটারি পাবলিক বা প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বর ও কনে উপস্থিত হয়ে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি লিখিত ঘোষণা দেন।

এই ঘোষণায় তারা উল্লেখ করেন যে— “আমরা প্রাপ্তবয়স্ক এবং নিজেদের স্বেচ্ছায়, কারো প্ররোচনা ছাড়াই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি।”

এই হলফনামাটি মূলত একটি ঘোষণাপত্র মাত্র, এটি কোনো বিয়ের দলিল বা কাবিননামা নয়।

৩. শুধু কোর্ট ম্যারেজ বা হলফনামা কি বৈধ বিয়ে?
সহজ উত্তর হলো- না, এটি কোনো বৈধ বিয়ে নয়। যদি কোনো যুগল কাজী অফিসে না গিয়ে, ধর্মীয় রীতি না মেনে কেবল কোর্টে গিয়ে হলফনামা সই করে ভাবেন তাদের বিয়ে হয়ে গেছে, তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বা আইনের চোখ, কোনদিক দিয়েই তারা স্বামী-স্ত্রী নন।

মুসলিম আইন অনুযায়ী বিয়ে বৈধ হতে হলে অবশ্যই:

ধর্মীয় নিয়ম মেনে ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) হতে হবে।

প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষীদের উপস্থিতি থাকতে হবে।

দেনমোহর ধার্য হতে হবে।

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী কাজী অফিসে গিয়ে সরকারি ভলিউমে বিয়ে রেজিস্ট্রি (কাবিননামা) করতে হবে।

৪. তাহলে কোর্ট ম্যারেজ বা হলফনামার দরকারটা কী?
আইনগতভাবে বিয়ের বিকল্প না হলেও, এই হলফনামার একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারিক গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে যখন কোনো ছেলে-মেয়ে পরিবারের অমতে বা পালিয়ে বিয়ে করেন, তখন তারা সুরক্ষার জন্য এটি করেন।

মিথ্যা মামলা থেকে বাঁচতে: পরিবার যদি বরের বিরুদ্ধে ‘অপহরণ’ বা ‘নারী নির্যাতন’- এর মিথ্যা মামলা করে, তখন এই হলফনামাটি আদালতে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যায় যে, মেয়েটিকে জোর করে আনা হয়নি, সে স্বেচ্ছায় এসেছে।

এটি মূলত একটি সম্পূরক প্রমাণ (Supportive Evidence) হিসেবে কাজ করে, কিন্তু বিয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে নয়।

৫. কাবিননামা না থাকলে যে আইনি বিপদ হতে পারে
কেউ যদি কাজী অফিসে রেজিস্ট্রি না করে শুধু কোর্ট ম্যারেজ করে সংসার শুরু করেন, তবে পরবর্তীতে কোনো বিরোধ বা বিশ্বাসভঙ্গ হলে স্ত্রী চরম বিপদে পড়বেন। কারণ:

কাবিননামা ছাড়া স্ত্রী আদালতে দেনমোহর বা ভরণপোষণের মামলা করতে পারবেন না।

স্বামীর মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করতে পারবেন না।

সন্তানের বৈধতা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সহজ কথায়, কোর্ট ম্যারেজ বা নোটারি পাবলিকের হলফনামা কখনোই কাবিননামার বিকল্প হতে পারে না। বিয়ে করতে হলে সবার আগে কাজী অফিসে গিয়ে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আইন মেনে রেজিস্ট্রি করতে হবে। এরপর বাড়তি সুরক্ষার জন্য চাইলে কোর্টের হলফনামা করে রাখা যেতে পারে। কাবিননামাই হলো একটি বিয়ের আসল প্রাণ।

Share the Post:
Scroll to Top