বিয়েতে পাওয়া গহনা কার সম্পত্তি?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “বিয়েতে পাওয়া গহনা কার সম্পত্তি?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, পারিবারিক ভাঙন বা কলহের সময় গহনা বা অলংকার নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয় না – এমন পরিবার কমই আছে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং শরিয়াহ বিধান অনুযায়ী এই গহনার মালিকানার সমীকরণটি নিচে পরিষ্কার করা হলো:

১. আইনি পরিভাষা: ‘স্ত্রীধন’ ও একক মালিকানা
বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম ও হিন্দু পারিবারিক আইন এবং সম্পত্তি আইন অনুযায়ী, বিয়েতে পাওয়া সমস্ত অলংকার সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ। আইনি পরিভাষায় একে বলা হয় ‘স্ত্রীধন’।

বিয়েতে কনেকে যে গহনা দেওয়া হয়, তা মূলত তাকে ‘দান’ (Gift) করা হয়। আইন অনুযায়ী, একবার কোনো উপহার বা দান গ্রহীতাকে হস্তান্তর করা হলে, দাতা আর সেটি ফেরত নিতে পারেন না।

অতএব, গহনা যার শরীরে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা যাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে, এর একক ও নিরঙ্কুশ মালিক কেবল তিনিই।

২. বর পক্ষের দেওয়া গহনা কি স্বামী ফেরত নিতে পারেন?
আমাদের সমাজে একটি বড় ভুল ধারণা আছে যে, বিয়ের সময় বর পক্ষ বা শাশুড়ির পক্ষ থেকে কনেকে যে গহনা দেওয়া হয়, বিচ্ছেদের সময় তা বর পক্ষ ফেরত নিতে পারবে। আইনত এটি সম্পূর্ণ অবৈধ।

বর পক্ষ বা স্বামী ভালোবেসে বা সামাজিক মর্যাদা রক্ষার্থে স্ত্রীকে যে গহনাই দিক না কেন, হস্তান্তরের পর তা স্ত্রীর একক সম্পত্তিতে পরিণত হয়।

স্ত্রী চাইলে সেই গহনা বিক্রি করতে পারেন, বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে পারেন বা যেকোনোভাবে ব্যবহার করতে পারেন। এতে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কোনো আইনি অধিকার থাকে না।

৩. কনে পক্ষের এবং আত্মীয়দের উপহার
কনের বাবা-মা, ভাই-বোন বা বিয়ের অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা উপহার হিসেবে যে গহনা দেন, তা তো সরাসরি কনের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবেই গণ্য হবে। এতে স্বামীর কোনো প্রকার অংশীদারিত্ব বা যৌথ মালিকানা দাবি করার সুযোগ নেই।

৪. দেনমোহর ও গহনার আইনি মারপ্যাঁচ
অনেক সময় স্বামীরা মনে করেন, বিয়ের সময় লাখ টাকার গহনা দিলে বোধহয় কাবিননামার দেনমোহর মাফ হয়ে যায় বা উসুল হয়ে যায়। এখানে একটি বড় আইনি শর্ত রয়েছে:

বিয়ের সময় দেওয়া গহনাকে যদি দেনমোহর বাবদ দেখাতে হয়, তবে কাবিননামার নির্ধারিত কলামে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে, “এত ভরি সোনার গহনা, যার মূল্য এত টাকা—তা দেনমোহর বাবদ উসুল হিসেবে দেওয়া হলো।”

যদি কাবিননামায় এটি সুনির্দিষ্টভাবে লেখা না থাকে, তবে সেই গহনাকে সাধারণ ‘উপহার’ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং স্বামীর দেনমোহরের দায় সম্পূর্ণ আলাদাভাবে বাকিই থেকে যাবে।

৫. স্ত্রীর অমতে গহনা নিলে আইনি পরিণতি
স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় তার অনুমতি ছাড়া স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কেউ যদি গহনা বিক্রি বা বন্ধক দেন, তবে তা আইনত ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ এবং ‘সম্পত্তি আত্মসাৎ’-এর শামিল।

পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, স্ত্রীর গহনা বা সম্পত্তি জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া বা আটকে রাখা অর্থনৈতিক সহিংসতার অন্তর্ভুক্ত, যা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।

বিচ্ছেদের সময় স্বামী গহনা আটকে রাখলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে তার গহনা বা সমমূল্যের টাকা উদ্ধার করতে পারেন।

বস্তুত, বিয়েতে পাওয়া এক রতি সোনাও স্বামীর সম্পদ নয়, তা সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর। পারিবারিক ক্রান্তিকালে স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় ও খুশিমনে স্বামীকে গহনা ব্যবহারের অনুমতি দেন, তবেই কেবল স্বামী তা নিতে পারেন, অন্যথায় নয়।

আইন জানুন, অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে শিখুন।

Share the Post:
Scroll to Top