প্রিয় পাঠক, দাম্পত্য সম্পর্ক থাকা অবস্থায় অধিকারের যে সমীকরণ থাকে, ডিভোর্স বা বিবাহ বিচ্ছেদের পর তা সম্পূর্ণ বদলে যায়। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, বিচ্ছেদের পর একে অপরের সম্পত্তির ওপর অধিকারের বিষয়টি নিচে স্পষ্ট করা হলো:
১. জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির মালিকানা
আমরা আমাদের পূর্বের আলোচনা থেকে জেনেছি যে, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ের পরও স্বামী বা স্ত্রী যার যার নিজস্ব সম্পত্তির একক ও পূর্ণ মালিক থাকেন।
বিচ্ছেদের পর: ডিভোর্স হয়ে গেলে একজনের সম্পত্তিতে অন্যজনের কোনো প্রকার দাবি বা যৌথ মালিকানা থাকে না। স্ত্রী তার নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাট বা ব্যাংক ব্যালেন্সের পূর্ণ মালিক থাকবেন; ঠিক একইভাবে স্বামীও তার নিজস্ব সম্পত্তির একক মালিক থাকবেন। ডিভোর্সের অজুহাতে কেউ কারো নিজস্ব সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে পারবে না।
২. যৌথ নামে কেনা সম্পত্তির ক্ষেত্রে কী হবে?
অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে (Joint Name) কোনো ফ্ল্যাট বা জমি কেনেন।
ডিভোর্স হওয়ার পর সেই সম্পত্তিতে যার যতটুকু অংশ বা শেয়ার (দলিল অনুযায়ী) ছিল, তিনি ঠিক ততটুকুরই মালিক থাকবেন।
বিচ্ছেদের পর তারা চাইলে নিজেদের অংশ অন্য পক্ষের কাছে বিক্রি করে দিতে পারেন, অথবা আদালতের মাধ্যমে ‘বাটোয়ারা মামলা’ (Partition Suit) করে সম্পত্তিটি আইনগতভাবে ভাগ করে নিতে পারেন।
৩. উত্তরাধিকার বা মিরাস-এর অধিকার
উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির অধিকার কেবল তখনই তৈরি হয় যখন স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে কেউ একজন মারা যান এবং তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকে।
ডিভোর্স কার্যকর হওয়ার পর: ডিভোর্স পুরোপুরি কার্যকর (৯০ দিনের নোটিশ পিরিয়ড শেষ) হয়ে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে আইনি ও ধর্মীয় সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এর পর যদি প্রাক্তন স্বামী বা স্ত্রীর কেউ একজন মারা যান, তবে জীবিত ব্যক্তিটি মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির কোনো অংশ উত্তরাধিকার (Inheritance) সূত্রে পাবেন না।
৪. নোটিশ চলাকালীন ৯০ দিনের বিশেষ পরিস্থিতি
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্যাঁচ রয়েছে। তালাকের নোটিশ পাঠানোর পর যে ৯০ দিন সময় থাকে (ইদ্দতকাল), সেই সময়ের মধ্যে তালাক কিন্তু চূড়ান্ত হয় না।
এই ৯০ দিনের মধ্যে যদি স্বামী বা স্ত্রীর কেউ একজন মারা যান, তবে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল ছিল ধরে নিয়ে জীবিত ব্যক্তিটি মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করবেন। ৯০ দিন পার হয়ে তালাক চূড়ান্ত হয়ে গেলে এই অধিকার আর থাকে না।
৫. দেনমোহর ও খোরপোশ কি সম্পত্তির অংশ?
ডিভোর্সের পর স্ত্রী সম্পত্তির সরাসরি ভাগ না পেলেও, তিনি তার পাওনা পূর্ণ দেনমোহর এবং ইদ্দতকালীন (৯০ দিনের) খোরপোশ নগদ অর্থ হিসেবে পাবেন। স্বামী যদি তা পরিশোধ না করেন, তবে স্ত্রী পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে স্বামীর সম্পত্তি ক্রোক (Attach) করিয়ে বা বিক্রি করিয়ে নিজের দেনমোহরের টাকা আদায় করতে পারেন।
সহজ কথায়, ডিভোর্স কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তির উত্তরাধিকার বা ভাগাভাগির সমস্ত আইনি পথ বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যেকে কেবল নিজ নিজ সম্পত্তির মালিক থাকেন। তবে সন্তানদের সম্পত্তির অধিকার বাবার ওপর সবসময়ই বজায় থাকে, বাবা-মায়ের ডিভোর্সের কারণে সন্তানের উত্তরাধিকার কখনো নষ্ট হয় না।