বাংলাদেশের আইনে মুখে তালাক বললে কি তালাক হয়ে যায়?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “বাংলাদেশের আইনে মুখে তালাক বললে কি তালাক হয়ে যায়?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, পারিবারিক কলহের জেরে অনেক সময় স্বামীরা মুখে ‘তালাক’ শব্দটির অপব্যবহার করে বসেন। কিন্তু বাংলাদেশের আইনি বাস্তবতা কী? চলুন পরিষ্কারভাবে জেনে নিই।

১. আইনি স্পষ্ট জবাব: মুখে তালাক বললে তালাক কার্যকর হয় না
বাংলাদেশের প্রচলিত ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’ (The Muslim Family Laws Ordinance, 1961) অনুযায়ী, কেবল মুখে ‘তালাক’বা ‘বাইন তালাক’বা ‘তিন তালাক’উচ্চারণ করলেই আইনগতভাবে কোনো তালাক সম্পন্ন বা কার্যকর হয় না। আইনের চোখে এই মৌখিক উচ্চারণের একক কোনো কার্যকারিতা নেই।

২. তালাক কার্যকরের বাধ্যতামূলক আইনি ধাপ
আইন অনুযায়ী, তালাক দিতে চাইলে মুখের কথার কোনো স্থান নেই; বরং নিচের তিনটি আইনি পদক্ষেপ ক্রমান্বয়ে এবং বাধ্যতামূলকভাবে সম্পন্ন করতে হবে:

ক. লিখিত নোটিশ: যে পক্ষ (স্বামী বা ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতাবলে স্ত্রী) তালাক দিতে চান, তাকে অবশ্যই লিখিতভাবে তালাকের নোটিশ তৈরি করতে হবে।

খ. চেয়ারম্যানকে অবগতি: সেই লিখিত নোটিশটি সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান, মেয়র বা কাউন্সিলর কার্যালয়ে পাঠাতে হবে।

গ. অপর পক্ষকে অনুলিপি: একই নোটিশের একটি অনুলিপি বা কপি রেজিস্ট্রি ডাকযোগে বা সরাসরি অপর পক্ষকে (স্বামী বা স্ত্রীকে) পাঠাতে হবে।

৩. ৯০ দিনের আইনি সময়সীমা
চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে লিখিত নোটিশটি পাঠানোর দিন থেকে আইন অনুযায়ী ৯০ দিন (তিন মাস) সময় গণনা শুরু হয়। এই ৯০ দিনের মধ্যে স্থানীয় চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি ‘সালিসি পরিষদ’গঠিত হয়, যার কাজ হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা।

যদি এই ৯০ দিনের মধ্যে কোনো আপস না হয় বা নোটিশ প্রত্যাহার করা না হয়, কেবল তখনই ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তালাকটি আইনগতভাবে চূড়ান্ত ও কার্যকর হবে।

এর আগে পর্যন্ত তারা আইনের চোখে সম্পূর্ণভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই গণ্য হবেন।

৪. হিল্লা বিয়ের কুসংস্কার ও আইন
মৌখিক তালাকের পর আমাদের সমাজে অনেক সময় জোরপূর্বক ‘হিল্লা বিয়ে’ বা অন্তর্বর্তীকালীন অন্য কারো সাথে বিয়ের ফতোয়া দেওয়া হয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।

আইন অনুযায়ী, তালাক কার্যকর হওয়ার পর (অর্থাৎ ৯০ দিন পর) যদি সেই দম্পতি আবার নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে একসাথে সংসার করতে চান, তবে কোনো প্রকার হিল্লা বিয়ে ছাড়াই তারা পুনরায় নতুন করে নিকাহ বা বিয়ে করতে পারবেন। আর যদি ৯০ দিনের মধ্যেই মিটমাট হয়ে যায়, তবে নতুন কোনো বিয়েরও প্রয়োজন পড়ে না।

৫. উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনা
বাংলাদেশের মহামান্য উচ্চ আদালত বিভিন্ন মামলায় স্পষ্ট রায় দিয়েছেন যে, নোটিশ ছাড়া কেবল মৌখিক বা চিঠির মাধ্যমে গোপনে দেওয়া তালাক আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ ও অকার্যকর। নোটিশের প্রাপ্তি স্বীকারের রশিদই হলো তালাক প্রক্রিয়ার একমাত্র আইনি প্রমাণ।

সহজ কথায়, রাগের মাথায় মুখে ১০০ বার তালাক বললেও আইনের চোখে আপনাদের বিয়ে ভাঙেনি। মুখে তালাক বলা কেবল একটি সামাজিক ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে, কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে না। তাই এই ধরণের কুসংস্কারে কান না দিয়ে আইনিভাবে সচেতন থাকা উচিত।

Share the Post:
Scroll to Top