বাবার দ্বিতীয় বিয়ের কারণে সন্তানের ওপর যে মারাত্মক প্রভাব পড়ে

আইন সহায়িকা ব্যানার। “বাবার দ্বিতীয় বিয়ের কারণে সন্তানের ওপর যে মারাত্মক প্রভাব পড়ে” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত কি শুধু স্বামী-স্ত্রীর বিষয়? নাকি সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সন্তানেরা? বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, নিষ্পাপ সন্তানদের জীবনে এর প্রভাব কতটা গভীর? চলুন বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, বাবার সংসারের সংখ্যা বাড়লেও, সন্তানদের প্রতি আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব কখনো কমে না!

একটি সুন্দর, গোছানো পরিবারে যখন হুট করে বাবার দ্বিতীয় বিয়ের খবর আসে, তখন সবচেয়ে বড় ঝড়টা যায় সন্তানদের ওপর দিয়ে। বড়রা হয়তো নিজেদের মতো করে আইনি বা সামাজিক পথ খুঁজে নেন, কিন্তু মাঝখান থেকে থমকে যায় সন্তানদের চিরচেনা পৃথিবীটা।

অথচ পারিবারিক যেকোনো বড় সিদ্ধান্তের সময় এই নিষ্পাপ মুখগুলোর কথা আমরা কতটুকুই বা ভাবি? সে হঠাৎ করে দেখতে পায়, তার পরিচিত পৃথিবী বদলে গেছে। বাবা-মায়ের মধ্যে যোজন-যোজন দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সংসারে অশান্তি বেড়েছে, আর তার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর প্রথম পক্ষের সন্তানেরা চরম অবহেলা ও মানসিক ট্রমার শিকার হয়। নিজ বাড়িতেই তারা হঠাৎ করে একরকম পরবাসী হয়ে পড়ে। বাবার ভালোবাসা, সময় এবং মনোযোগ ভাগ হয়ে যাওয়ায় তারা হীনম্মন্যতায় ভোগে, যার প্রভাব পড়ে তাদের পড়াশোনা ও মানসিক বিকাশে। এর চেয়েও বড় জটিলতা তৈরি হয় তখন, যখন সম্পত্তি আর মৌলিক অধিকার নিয়ে ঘরে ঘরে শুরু হয় তীব্র পারিবারিক বিরোধ ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি।

আইনগত ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স:

আইন ও ধর্ম – উভয় জায়গাতেই স্পষ্ট বলা আছে যে, বাবার বিয়ের সংখ্যা বাড়লেও সন্তানদের প্রতি তার দায়িত্ব ও আইনি বাধ্যবাধকতা বিন্দুমাত্র কমে না।

ভরণপোষণ ও পড়াশোনার দায়িত্ব: মুসলিম আইন এবং বাংলাদেশের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সন্তানের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও পড়াশোনার যাবতীয় খরচ বহন করা বাবার আইনি কর্তব্য। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলেও প্রথম পক্ষের সন্তানদের এই অধিকার ক্ষুণ্ণ করার কোনো সুযোগ নেই। খরচ না দিলে আদালতের মাধ্যমে তা আদায় করা সম্ভব।

সম্পত্তির উত্তরাধিকার: বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, বাবার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে প্রথম ও দ্বিতীয়, উভয় পক্ষের সন্তানদের সমান অধিকার থাকে। অনেকেই মনে করেন দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম পক্ষের সন্তানেরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আইন অনুযায়ী প্রথম পক্ষের সন্তানদের হরণ করে কোনো সম্পত্তি কেবল দ্বিতীয় পক্ষকে লিখে দিলে, তা পরবর্তীতে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায়।

সন্তানের জিম্মাদারী (Hizanat): বাবা-মায়ের মধ্যে পারিবারিক টানাপোড়েন বা বিচ্ছেদ তৈরি হলেও নাবালক সন্তানের মায়ের কাছে থাকার অধিকার (হিজানত) আইনগতভাবে সুরক্ষিত। এই পরিস্থিতিতেও বাবা সন্তানের নিয়মিত খরচ দিতে বাধ্য থাকবেন।

এর বাহিরে সন্তানের মনোজগতে পিতার দ্বিতীয় বিয়ের কারণে যে আঘাতটি আসে তা হলো, মানসিক আঘাত, নিজেকে দায়ি ভাবার অচেনা ভয়। অন্যদিকে, অনেক শিশু ও কিশোর মনে করে, বাবা তাকে আগের মতো গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এতে তাদের মধ্যে হতাশা, রাগ, নিরাপত্তাহীনতা এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

পারিবারিক ভাঙন ও সম্পর্কের টানাপোড়েন সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ঝগড়া বা বিচ্ছিন্নতা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এসবের বাহিরেও, ভবিষ্যতে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। দ্বিতীয় সংসারে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে পারিবারিক বিরোধ দেখা দিতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, বৈধ বিবাহ থেকে জন্ম নেওয়া সকল সন্তান আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকারী।

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইনের আলোকে একজন পিতা তার সকল সন্তানের প্রতি সমান দায়িত্বশীল। সন্তানের ভরণপোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা তার আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব। দ্বিতীয় বিয়ে করলেই এই দায়িত্ব কোনোভাবেই কমে যায় না।

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961) অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনগত বিধান রয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ এবং প্রচলিত পারিবারিক আইন সন্তানের কল্যাণ ও অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

একজন দায়িত্বশীল বাবা কখনো শুধু নিজের সিদ্ধান্তের কথা ভাবেন না; তিনি ভাবেন, সেই সিদ্ধান্ত তার সন্তানের জীবন, শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের ওপর কী প্রভাব ফেলবে। স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ একদিন মিটে যেতে পারে, কিন্তু শৈশবে পাওয়া মানসিক ক্ষত অনেক সময় সারাজীবন থেকে যায়।

আইনজীবীর পরামর্শ: দ্বিতীয় বিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো ব্যক্তির আইনি অধিকার হতে পারে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের কারণে নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল বাবার কাজ হতে পারে না। পারিবারিক যেকোনো সংকটে জিদ বা আবেগের বশে সন্তানদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন না। যদি এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন যেখানে সন্তানের আইনি অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, তবে সঠিক আইনি সুরক্ষার জন্য একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

Share the Post:
Scroll to Top